যে ম্যাচের আগে ফুটবলবিশ্ব এক জমজমাট ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছিল, মাঠের লড়াইয়ে তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাওয়া গেল না। উল্টো পুরো ম্যাচজুড়ে মাঠের সবুজ ঘাসে এক নির্বিষ ফ্রান্সকে স্রেফ নাচিয়ে ছাড়ল লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। দুই অর্ধে চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলে দুইবার ফরাসিদের জাল কাঁপিয়ে দুর্দান্ত জয় তুলে নিল স্পেন। এই অসাধারণ ও রাজকীয় পারফরম্যান্সে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল ‘লা রোহারা’।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে অনুষ্ঠিত ২০২৬ আসরের প্রথম হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স কোনো পাত্তাই পায়নি। কিলিয়ান এমবাপেদের অনায়াসে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে স্পেন। প্রথমার্ধে সফল পেনাল্টি থেকে মিকেল ওইয়ারজাবালের করা গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো।
১৬ বছরের খরা কাটিয়ে শিরোপার দোরগোড়ায় স্পেন
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করল স্পেন। এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবার ফাইনালে উঠেছিল তারা, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল লা রোহারা। এরপরের তিনটি বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২) স্প্যানিশদের পারফরম্যান্স ছিল চরম ব্যর্থতায় মোড়ানো। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব এবং পরের দুই আসরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার সেই বৃত্ত ভেঙে অবশেষে শিরোপা পুনরুদ্ধারের ম্যাচ থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
অন্যদিকে, কিলিয়ান এমবাপে, মাইকেল ওলিসে ও উসমান দেম্বেলেদের মতো বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের তারকাদের নিয়ে গড়া ফ্রান্স সেমিফাইনালের মঞ্চে ন্যূনতম কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেনি। মাঝমাঠের চরম ব্যর্থতায় তারা কোনো আক্রমণই তৈরি করতে পারেনি, যার ফলে স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের বেকায়দায় ফেলার মতো কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি ফরাসিরা।
মাঝমাঠের দখল ও স্পেনের রণকৌশল
গোটা টুর্নামেন্টে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়ে হট ফেভারিট হিসেবে সেমিফাইনালে নেমেছিল ফ্রান্স। কিন্তু স্পেনের নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ছকের সামনে ফরাসি আক্রমণভাগ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি। তাঁকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো। স্পেনের এই ত্রয়ী বলের পজিশন নিজেদের কাছে রেখে ফরাসিদের কোনো ছন্দই গড়তে দেয়নি। মাঝমাঠে স্পেনের খেলোয়াড়দের আধিক্যের বিপরীতে ফ্রান্সের আদ্রিয়েন রাবিও ও আহেলিয়া চুয়ামেনিকে নিয়ে গড়া দুই সদস্যের মাঝমাঠ স্রেফ খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে।
শুরুর দিকে পাল্টা আক্রমণে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল ফ্রান্স। ম্যাচের ১৬তম মিনিটে গোলমুখে বল নিয়ে বিপজ্জনকভাবে ছুটছিলেন এমবাপে, তবে ঠিক তখনই পাউ কুবারসি দুর্দান্ত এক ব্লকে ফ্রান্সকে গোলবঞ্চিত করেন।
পেনাল্টিতে লিড ও সালিব্বার চোটের ধাক্কা
স্পেনের মুহুর্মুহু চাপের ফল আসে ম্যাচের ২০তম মিনিটে। মার্ক কুকুরেয়ার ক্রস ফরাসি রক্ষণভাগের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করলে ডি-বক্সের ভেতরে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে বসেন ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে ঠাণ্ডা মাথায় স্পট-কিক থেকে গোলরক্ষক মাইক মিনিয়ঁকে পরাস্ত করে স্পেনকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন ওইয়ারজাবাল।
৩১তম মিনিটে ফ্রান্সের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হয়, যখন তাদের মূল সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা দুর্ভাগ্যজনকভাবে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। প্রথমার্ধের শেষদিকে চমৎকার পাসিং ফুটবলে ফরাসি রক্ষণ চূর্ণ করে আরও একটি ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল স্পেন, তবে সে যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ান দায়োত উপামেকানো।
পোরোর ক্লাসিক গোল ও এমবাপের হলুদ কার্ড
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই গতবারের রানার্সআপ ফ্রান্সের ঘুরে দাঁড়ানোর সমস্ত আশা ধূলিসাৎ করে দেয় স্পেন। ৫৮তম মিনিটে তাদের করা দ্বিতীয় গোলটি ছিল আধুনিক আক্রমণাত্মক ফুটবলের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। ওলমোর সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টু-ওয়ান পাসিংয়ে বল দেওয়া-নেওয়া করে পেদ্রো পোরো ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন এবং কোনাকুনি শটে মিনিয়ঁর মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়ান (২-০)।
কিছুক্ষণ পরই ইয়ামাল বল জালে জড়ালে অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফরাসি কোচ দিজিরে দুয়ে ও রায়ান চেরকির মতো তারকাদের মাঠে নামালেও স্পেনের সুশৃঙ্খল ডিফেন্সের সামনে তারা পরাস্ত হয়। ব্যবধান কমানোর শেষ সুযোগটি এমবাপে পেয়েছিলেন, তবে তাঁর নেওয়া শটটি ক্ষিপ্রতার সাথে রুখে দেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। ম্যাচের শেষদিকে সিমনের সাথে বলের দখল নিতে গিয়ে বিপজ্জনক ট্যাকল করে উল্টো হলুদ কার্ড দেখেন হতাশ এমবাপে।
এই নিয়ে টানা তিনটি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে (২০২৪ ইউরো, ২০২৫ নেশন্স লিগ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ) ফ্রান্সকে বিদায় করল স্পেন। আগামী রোববার রাতে নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচের জয়ী দলের মুখোমুখি হবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের অপ্রতিরোধ্য স্পেন।
