গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশের সফল প্রত্যাবর্তনের পর দেশটির সঙ্গে ফ্রান্সের দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন ও শক্তিশালী গতি লাভ করেছে। বাণিজ্য, বৈশ্বিক বিনিয়োগ, উচ্চশিক্ষা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সহযোগিতা আরও বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত করতে ফ্রান্স অত্যন্ত আগ্রহী।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যায় ঢাকাস্থ ফ্রান্স দূতাবাসে দেশটির ঐতিহাসিক ‘বাস্তিল ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে (Jean-Marc Séré-Charlet) এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন বা নবনির্বাচিত সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও বিশিষ্টজনেরা এই জাতীয় দিবসের আয়োজনে অংশ নেন।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারের প্রশংসা
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, “সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে আবারও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের মর্যাদাপূর্ণ কাতারে সগৌরবে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রতি এই দৃঢ় অঙ্গীকারে প্যারিস (ফ্রান্স সরকার) গভীরভাবে মুগ্ধ ও আলোড়িত।”
রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তাঁকে বিশেষ বার্তা ও দায়িত্ব দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর, বহুমুখী ও শক্তিশালী করা। তিনি জানান, ফ্রান্স মূলত উভয় দেশের ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, উচ্চতর গবেষক ও সৃজনশীল শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও মেলবন্ধনকে আরও বেগবান করতে চায়।
জলবায়ু তহবিল ও উন্নয়নে ২০০ কোটি ইউরোর সহযোগিতা
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ফরাসি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, “বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (AFD) ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি ইউরো ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। অত্যন্ত আশার কথা হলো, এই ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার মোট অর্থায়নের ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রকল্প সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নিবেদিত রয়েছে।”
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অংশীদারিত্ব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, “সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক (Indo-Pacific) অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি রক্ষা, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিতকরণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে ফ্রান্স। পাশাপাশি সময়ের দাবি মেনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), আধুনিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক সমুদ্র সংরক্ষণের মতো অত্যাধুনিক খাতগুলোতেও দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ অংশীদারিত্ব জোরদার করার ব্যাপারে ফ্রান্সের গভীর আগ্রহ রয়েছে।”
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে ফরাসি রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পরবর্তী সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক মহলের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও বিশাল অর্জন।” সবশেষে তিনি দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ফ্রান্স মৈত্রীকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
