আন্দোলনের শঙ্কায় এইচএসসি কেন্দ্রে অভিভাবকদের বাড়তি উপস্থিতি

সারাদেশে চলমান তীব্র শিক্ষার্থী আন্দোলন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা স্থগিতের জোরালো দাবি এবং আজ পরীক্ষা শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘লংমার্চ’ কর্মসূচিকে ঘিরে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নজিরবিহীন সতর্কতা ও উৎকণ্ঠা দেখা গেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে অন্য যেকোনো দিনের তুলনায় আজ অভিভাবক ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অধিকাংশ অভিভাবকই আজ সন্তানদের একা ছাড়েননি; বরং পরীক্ষা চলাকালীন দীর্ঘ সাড়ে ৩ ঘণ্টা কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করে পরীক্ষা শেষে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে ঘরে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আজ বুধবার (১৫ ১৫ জুলাই ২০২৬) সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সপ্তম দিনের পরীক্ষা ঘিরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সরকারি বিজ্ঞান কলেজ কেন্দ্রসহ ফার্মগেট ও ধানমন্ডির বেশ কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্র সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা, ঘরে ফেরার তাড়া

সকাল থেকেই পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর সামনে পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি হাজার হাজার অভিভাবকের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে কেউ গাছের ছায়ায়, কেউ ফুটপাতে, আবার কেউ কেন্দ্রের মূল ফটকের আশপাশে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে অপেক্ষা করছিলেন।

পরীক্ষা শেষে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর উত্তরার বিএনএস (BNS) সেন্টার থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে একটি বিশাল ‘লংমার্চ’ (Long March) কর্মসূচি পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজপথে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা দেখা গেছে।

সরকারি বিজ্ঞান কলেজ কেন্দ্রের বাইরে গভীর উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন অভিভাবক নাসরিন আক্তার। দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে তিনি বলেন, “গত কয়েক দিনের দেশের ও রাজধানীর রাজপথের পরিস্থিতি দেখে ছেলেমেয়েদের একা পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠিয়ে কোনোভাবেই নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না। কখন কী হয় বলা যায় না। তাই আজ সকাল থেকেই দাঁড়িয়ে আছি, পরীক্ষা শেষে মেয়েকে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে তবেই বাসায় ফিরব।”

আরেক পরীক্ষার্থীর পিতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা চাই পরীক্ষাগুলো সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে শেষ হোক। তবে পরীক্ষা শেষে ছাত্রদের যেহেতু একটি বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে, তাই সন্তান যেন কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্যই অফিসের ছুটি নিয়ে কেন্দ্রে অপেক্ষা করছি।” একইভাবে অভিভাবক আবদুল কাদের বলেন, “অন্যান্য দিন সাধারণত পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে কেন্দ্রে আসতাম। কিন্তু আজকের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সকাল থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। ছেলে পরীক্ষা শেষ করে বের হলেই তাকে নিয়ে সোজা বাসায় চলে যাব।”

একনজরে আজকের অনুষ্ঠিত পরীক্ষার খতিয়ান

আজ বুধবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সপ্তম দিনে দেশের আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র, ব্যবসায়ী শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র এবং মানবিক বিভাগের যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষার্থীদের আরবি দ্বিতীয় পত্র এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-২ বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ৩ দফা দাবি ও শিক্ষা বোর্ডের অনমনীয় সিদ্ধান্ত

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সায়েন্সল্যাব মোড় অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রধান ৩ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে: ১. দেশে চলমান বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা। ২. গত ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়া ও মারাত্মক জলাবদ্ধতার কারণে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি বা কেন্দ্রে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ পুনঃপরীক্ষার (রি-এক্সামিন) দ্রুত ব্যবস্থা করা। ৩. শিক্ষা খাতে চলমান অব্যবস্থাপনার দায়ে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর অনতিবিলম্বে পদত্যাগ।

তবে শিক্ষার্থীদের এই তীব্র আন্দোলন ও লংমার্চ কর্মসূচির মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনমনীয় রয়েছে প্রশাসন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতিবৃষ্টি ও মারাত্মক জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। দেশের অন্য বাকি সব শিক্ষা বোর্ডে পূর্বঘোষিত রুটিন ও সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা যথানিয়মে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠকেও নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করার এই কঠোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *