মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে নতুন আইন হবে আরও কঠোর ও কার্যকর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রোধ, আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মতো জঘন্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে নবপ্রণীত আইনটি অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, “অপরাধী চক্র দিন দিন প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তাদের এই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল কৌশলের সঙ্গে নিখুঁতভাবে তাল মিলিয়ে আমাদের আইনি কাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে।”

আজ বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত ‘মানব পাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক জাতীয় অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান মোকাবিলায় আধুনিক আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অঙ্গীকার আরও জোরালো ও দৃশ্যমান করার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশ যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

দেশি-বিদেশি শীর্ষ কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের উপস্থিতি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই জাতীয় অবহিতকরণ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের প্রতিনিধিরা।

বিশেষ অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ।

অপরাধ দমনে মাইলফলক ‘২০২৬ সালের নতুন আইন’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে শক্তিশালী আইন, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সুসমন্বয় এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান সম্পূর্ণ নির্মূলে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ়, আপসহীন ও অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, “সদ্য প্রণীত ‘মানবপাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ এসব মারাত্মক আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনের ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এই নতুন ও আধুনিক আইনটির শতভাগ সফল বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দেশের বিচার বিভাগ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের (Civil Society) মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ ও নিবিড় সহযোগিতা অত্যন্ত অপরিহার্য।”

নতুন আইনের ৫টি মূল ও অনন্য বৈশিষ্ট্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন আইনের বিশেষ দিকগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে জানান, এই আইনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আইনটির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: ১. অপরাধের স্পষ্ট পৃথকীকরণ: নতুন আইনটিতে ‘মানবপাচার’ এবং ‘অভিবাসী চোরাচালান’—এই দুটিকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ২. সমন্বিত আইনি কাঠামো: আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে অভিবাসী চোরাচালানকে শক্ত হাতে দমন ও দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ৩. তদন্ত ও বিচারিক ক্ষমতা বৃদ্ধি: আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তদন্ত পরিচালনা এবং বিচার বিভাগের দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির ক্ষমতা ও পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। ৪. ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা: অপরাধীদের হাত থেকে ভুক্তভোগী (Victims) এবং মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ৫. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক নীতি: আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বহিরাগত সহযোগিতা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। একই সাথে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়া ভুক্তভোগীদের কোনো প্রকার শাস্তি না দেওয়ার মানবিক নীতি সমুন্নত রাখা হয়েছে, যাতে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে তাদের মানবিক মর্যাদা, আইনি অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় ও জাতীয় সমন্বয়

জাতীয় পর্যায়ের এই অবহিতকরণ অনুষ্ঠানটি আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন আইনের ধারা ও উপধারা সম্পর্কে একটি অভিন্ন, সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নতুন আইন প্রণয়নের প্রেক্ষাপট, এর সামাজিক যৌক্তিকতা এবং প্রধান প্রধান বিধানগুলোর ওপর একটি বিশেষ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন।

এরপর নতুন আইন বাস্তবায়নের অগ্রাধিকারসমূহ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি পর্যন্ত ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে কঠোর সমন্বয় জোরদার করাসহ আইনটির কার্যকর প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, সিআইডি (CID), পুলিশের বিশেষ শাখা (SB), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI), বিচার বিভাগ, প্রসিকিউশন, কূটনৈতিক মিশন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে তাদের মূল্যবান মতামত পেশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *