বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি বেড়ে ৫৪, পানিবন্দি দেড় লাখের বেশি পরিবার

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা প্রলয়ঙ্কারী পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যা এবং পাহাড়ধস পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন পর্যন্ত মোট ৫৪ জন নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন। দেশের সাতটি প্রধান জেলায় বর্তমানে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। সব মিলিয়ে উপদ্রুত অঞ্চলগুলোর ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন মানুষ সরাসরি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) রাতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি, প্লাবিত ৫৯ উপজেলা

সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা মারাত্মকভাবে বন্যাকবলিত হয়েছে। ভয়াবহ এই পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে এই সাত জেলার মোট ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এর পাশাপাশি উপদ্রুত অঞ্চলগুলোর ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলাভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মৃত ৫৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে পর্যটন জেলা কক্সবাজারে; সেখানে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ৩১ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে আহত ৩৯ জনের চিকিৎসাগত পরিসংখ্যানে জানা গেছে, কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে ১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

দুর্যোগগ্রস্ত ও গৃহহীন হয়ে পড়া বিপন্ন মানুষকে জরুরি আশ্রয় দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে ইতিমধ্যে ১ হাজার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র (Cyclone/Flood Shelter) খোলা হয়েছে। যেখানে এ পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৪২২ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। আশ্রিতদের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে।

১১ জেলায় চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল, বিশেষ মেডিক্যাল টিম মোতায়েন

এদিকে বন্যাকবলিত ও উপদ্রুত ১১টি জেলায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাব্যবস্থা সচল রাখতে স্থানীয় চিকিৎসক, নার্স ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে বন্যার্তদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় বিশেষ মেডিক্যাল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

জরুরি এই স্বাস্থ্য পদক্ষেপের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে বলেন, “চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে দেশের উপদ্রুত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবন রক্ষা নিশ্চিত করাকে সরকার এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও সাপের উপদ্রব বাড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ জরুরি ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম (সাপের বিষ প্রতিষেধক) এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, “বর্তমানে দেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ১১টি বিশেষ জেলায় বিশেষ ও নিবিড় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম (Emergency Health Operations) পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিটি জেলার সার্বিক পরিস্থিতি ও চিকিৎসা কার্যক্রম সরাসরি মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে (সিনিয়র কনসালটেন্ট/পরিচালক) লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ (Control Room) দেশের বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও বিভাগীয় সমন্বয়ের কাজ করে যাচ্ছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *