আফ্রিকান মহাদেশের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকায় নথিপত্রহীন ও অবৈধ বিদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বৃহত্তম ও কঠোর সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই বিশেষ ‘অভিবাসন ব্যবস্থাপনা’ (Migration Management) অভিযানের আওতায় এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিককে আটক করে জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বা নির্বাসিত করা হয়েছে। সরকারের এই সাঁড়াশি অভিযান দেশজুড়ে এখনও চলমান থাকায় নির্বাসিত বিদেশিদের এই সংখ্যা আগামী দিনগুলোতে আরও ব্যাপক হারে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে অভিবাসনবিরোধী উগ্র গোষ্ঠীগুলোর তীব্র বিক্ষোভ, দেশব্যাপী সহিংসতা, বিদেশি নাগরিকদের ভীতি প্রদর্শন এবং তাদের দোকানপাটে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনার পর নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এই কঠোরতম অভিযান শুরু করে প্রশাসন। বিক্ষোভকারীরা দেশের ক্রমবর্ধমান উচ্চ বেকারত্ব, লাগামহীন অপরাধের হার বৃদ্ধি এবং পানি ও বিদ্যুতের মতো সরকারি পরিষেবাগুলোর পতনের জন্য সরাসরি বিদেশি অভিবাসীদের দায়ী করে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও গণনির্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
মানবাধিকার রক্ষা ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের বার্তা সরকারের
রোববার (১২ জুলাই ২০২৬) দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়ায় আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিচার ও সাংবিধানিক উন্নয়নমন্ত্রী মামোলোকো কুবায়ি (Mamoloko Kubayi) এই অভিযানের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোট ৫৩ হাজার ৪৯৯ জন বিদেশি নাগরিককে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। নির্বাসিতদের তালিকায় সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন আফ্রিকার দেশ মালাউইয়ের (Malawi) নাগরিক। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিবেশী রাষ্ট্র জিম্বাবুয়ে ও মোজাম্বিকের বিপুল সংখ্যক নাগরিকও এই নির্বাসনের তালিকায় রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী কুবায়ি বলেন, “আমাদের সরকার এমন একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মিত ও আইনি অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যা একদিকে দেশের সাধারণ জনগণের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, অন্যদিকে নাগরিকত্ব বা অভিবাসন অবস্থান-নির্বিশেষে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সবার মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে।” তিনি আরও জানান, এই পাঁচ সপ্তাহের চিরুনি অভিযান পরিচালনার সময় এমন কিছু বিপজ্জনক দাগি অপরাধীকেও আটক করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল।
তবে মন্ত্রী কুবায়ি স্থানীয় উগ্র বিক্ষোভকারীদের কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “কর্তৃপক্ষ তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে। কিন্তু সাধারণ বিক্ষোভকারীরা যেন কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে না নেয় এবং এমন কোনো বাড়ি বা ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অননুমোদিত ও বেআইনি তল্লাশি না চালায়, যেখানে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়ার সন্দেহ রয়েছে। এই কাজ কেবল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার।”
বলির পাঁঠা না বানানোর আহ্বান জাতিসংঘের, আতঙ্কিত বহু দেশ
দক্ষিণ আফ্রিকার চলমান এই তীব্র অভিবাসনবিরোধী জটিল পরিস্থিতি ও আর্থ-সামাজিক সংকটের জন্য ঢালাওভাবে বিদেশি অভিবাসীদের দায়ী না করার জন্য বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ (UN)। বিশ্ব সংস্থাটি এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের জন্য অভিবাসীদের এভাবে এককভাবে ‘বলির পাঁঠা’ (Scapegoat) বানানো হলে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও জটিল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করেই অভিবাসনবিরোধী স্থানীয় আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার নতুন ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশটিতে নতুন করে জাতিগত ও বর্ণবাদী সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে।
এর আগে বিক্ষোভকারীরা নথিপত্রহীন সকল অবৈধ বিদেশিদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার জন্য গত ৩০ জুনকে একটি ‘অনানুষ্ঠানিক সময়সীমা’ (Deadline) নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এই আলটিমেটামের পর উগ্রপন্থীদের হাত থেকে বাঁচতে এবং সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে হাজার হাজার বৈধ-অবৈধ বিদেশি নাগরিক স্বেচ্ছায় দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে নিজ দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এদিকে উদ্ভূত অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে ঘানা, নাইজেরিয়া, উগান্ডা ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশেষ চার্টার্ড বিমানযোগে তাদের আতঙ্কিত নাগরিকদের দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে।
প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি ও উন্নত অর্থনীতির আকর্ষণ
দক্ষিণ আফ্রিকার মহামান্য প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা (Cyril Ramaphosa) দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অভিবাসন নিয়ে সাধারণ জনগণের দীর্ঘদিনের বৈধ উদ্বেগের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় অভিবাসীদের ওপর যেকোনো ধরনের শারীরিক হামলা ও বর্ণবাদী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দেশটির নাগরিকদের আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকার অন্যান্য অনুন্নত রাষ্ট্র এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জীবন ও অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে আসা লাখ লাখ অভিবাসীদের প্রধান আকর্ষণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বৈধ নথিপত্র নিয়ে আসলেও, একটি বড় অংশই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল।
