ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক হামলার নেতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধীরগতি ও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক সংকটের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের ওপরও। যুদ্ধজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বেইজিং তাদের নির্ধারিত বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (GDP Growth) লক্ষ্যমাত্রা থেকে লক্ষ্যণীয়ভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির (BBC) প্রকাশিত এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে কমল প্রবৃদ্ধি, লক্ষ্যমাত্রার নিচে বেইজিং
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (এপ্রিলের শুরু থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত) চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। চীনের সরকারি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশটিতে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা বেইজিংয়ের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ নিচে রয়েছে। এর আগে চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ।
উল্লেখ্য, বিশ্ব পরিস্থিতির জটিলতা মাথায় রেখে গত মার্চ মাসেই চীন তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে পুনঃনির্ধারণ করেছিল। এটি ১৯৯১ সালের পর দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হওয়া সত্ত্বেও চলমান যুদ্ধের প্রভাবে তাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ আবাসন মন্দার দ্বিমুখী চাপ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই মন্দার পেছনে মূলত দ্বিমুখী সংকট কাজ করছে। একদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় চীনের বৈশ্বিক রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও চরম চাহিদা হ্রাস পেয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত বেইজিংয়ের পৃথক কিছু অর্থনৈতিক তথ্যে দেখা গেছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো আরও প্রকট হচ্ছে। এর মধ্যে চীনের আবাসন বাজারে (Real Estate Market) দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং সাধারণ মানুষের দুর্বল ভোক্তা ব্যয়ের বিষয়টি অন্যতম। দেশটিতে নতুন তৈরি হওয়া আবাসনের দাম আরও কমেছে, যদিও খুচরা বিক্রি (Retail Sales) সামান্য বেড়েছে।
বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ‘আইজ’ (IG)-এর প্রধান বাজার বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইপ বিবিসিকে বলেন, “চীনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে জ্বালানি ও কাঁচামালের লাগামহীন উচ্চ মূল্যের চাপ সামলাতে তীব্র হিমশিম খাচ্ছে। বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের চাহিদা এতটাই কমে গেছে যে, উৎপাদন ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ ক্রেতারা পুরোপুরি সামাল দিতে পারছেন না।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, চীনের পক্ষে এই বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ততটাই কঠিন হয়ে উঠবে।”
আশার আলো দেখাচ্ছে প্রযুক্তি পণ্য ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV)
সার্বিক মন্দা ও আবাসন খাতের চরম সংকটের মধ্যেও চীনের প্রযুক্তি ও অটোমোবাইল খাত বেইজিংয়ের অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে টিকিয়ে রেখেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছরের জুনে দেশটির সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য অবিশ্বাস্যভাবে ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত জুন মাসের আন্তর্জাতিক শুল্কসংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য সেমিকন্ডাক্টরের (Semiconductor) বৈশ্বিক চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চীনের প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি এক লাফে নতুন গতি পেয়েছে।
একই সঙ্গে, বিশ্ববাজারে চীনা বৈদ্যুতিক যানবাহনের (EV) ক্রমবর্ধমান ও আকাশচুম্বী চাহিদা দেশটির সামগ্রিক রপ্তানি খাতকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছে। এর ফলে চীনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাসিক গাড়ি রপ্তানির পরিমাণ ১০ লাখের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। প্রযুক্তি ও ইভি খাতের এই অভূতপূর্ব জোয়ারের কারণেই প্রবৃদ্ধি কমলেও চীন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস এড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
