ইকুয়েডরে পুলিশের ছদ্মবেশে হামলা, কুখ্যাত ‘লস চোনেরোস’ গ্যাং নেতাকে গুলি করে হত্যা

লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে মাদক পাচার ও গ্যাং সংস্কৃতির রক্তক্ষয়ী আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে আরও এক শীর্ষ অপরাধী চক্রের নেতা নিহত হয়েছেন। দেশটির সবচেয়ে কুখ্যাত ও সহিংস অপরাধী চক্র ‘লস চোনেরোস’ (Los Choneros)-এর অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক প্রধান ডেভিড মাসিয়াসকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ইকুয়েডর জাতীয় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত রোববার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশ কর্মকর্তার ছদ্মবেশ ধারণ করে আসা একদল সশস্ত্র বন্দুকধারী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

দেশটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলের পর্যটন শহর ওলোন-এ (Olón) এই চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ বছর বয়সী ডেভিড মাসিয়াস ওলোন শহরের একটি ভাড়া করা বিলাসবহুল বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার দিন নিখুঁতভাবে পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন বন্দুকধারী ভুয়া পরিচয় দিয়ে তাঁর বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ডেভিডকে লক্ষ্য করে অতর্কিত ও নির্বিচার গুলি চালিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে। অত্যন্ত সুরক্ষিত এই অপরাধী নেতাকে হত্যার পরপরই ঘাতক দল দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ পুরো এলাকা কর্ডন বা ঘেরাও করে তল্লাশি চালালেও এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

কারাগারে গ্যাং বিস্তার ও ফিতো’র ভাই ডেভিড

ইকুয়েডর পুলিশের অপরাধ নথির তথ্য অনুযায়ী, নিহত ডেভিড মাসিয়াস অপরাধ জগতে এক পরিচিত নাম। এর আগে ২০১৮ সালে তিনি একটি বৃহৎ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের গুরুতর অভিযোগে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেছিলেন। পরবর্তীতে কারাগারে সাজা ভোগ করার সময় তিনি ‘লস চোনেরোস’-এর জন্য সক্রিয়ভাবে নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ ও গ্যাং রিক্রুটমেন্টের কাজ চালাতেন। ইকুয়েডরের একটি প্রধান ও উচ্চ-নিরাপত্তাসম্পন্ন কারাগারে এই মাদক চক্রটির শক্ত অবস্থান ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলার পেছনে ডেভিডের একক ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব ছিল বলে মনে করে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা।

উল্লেখ্য, ডেভিড মাসিয়াসের আপন ভাই অ্যাডলফো মাসিয়াস (যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতে ‘ফিতো’ বা Fito নামে সমধিক পরিচিত) বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল হেফাজতে বিচারাধীন রয়েছেন। গত বছর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ইকুয়েডর সরকার তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ (Extradition) করে। মার্কিন প্রশাসন ইতিমধ্যেই ‘লস চোনেরোস’কে একটি বিপজ্জনক ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ (Foreign Terrorist Organization) হিসেবে ঘোষণা করে তাদের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও মাদক রুট বন্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে।

আধিপত্যের লড়াইয়ে ইকুয়েডরে লাশের মিছিল, ভঙ্গুর নিরাপত্তা

ইকুয়েডরে বর্তমানে মাদক চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুট ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোর মধ্যে নিয়মিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশে নিজ দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর ভাড়াটে খুনিদের হাতে শীর্ষ গ্যাং নেতাদের প্রায়ই নির্মম হামলার শিকার হতে হচ্ছে। এই ওলোন শহরের হত্যাকাণ্ডের ঠিক এক মাস আগেই দেশটির অন্যতম ব্যস্ত গুয়াকিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (Guayaquil International Airport) বাইরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক শীর্ষ গ্যাং নেতাকে বন্দুকধারীরা গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, যা দেশটির ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ডেভিড মাসিয়াসের এই হত্যাকাণ্ড ‘লস চোনেরোস’ মাদক সাম্রাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ একটি ধাক্কা। কারণ, গত বছর তাদের মূল প্রধান অ্যাডলফো মাসিয়াস ওরফে ফিতো গ্রেপ্তার হন এবং ঠিক গত মাসে কলম্বিয়ায় পলাতক থাকা অবস্থায় তাদের আরেক সহোদর ও শীর্ষ নেতা হাভিয়ের মাসিয়াস কলম্বিয়ান পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হন। দুই ভাইয়ের পর এবার মাঠপর্যায়ে গ্যাং সচল রাখা তৃতীয় ভাই ডেভিডের এই আকস্মিক হত্যাকাণ্ড লস চোনেরোসকে ইকুয়েডরের অপরাধ মানচিত্র থেকে একপ্রকার নেতৃত্বশূন্য ও চূড়ান্ত পতনের দিকে ঠেলে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *