সৌদি আরবের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে এবং ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতে সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান দুই নৌপথ হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার এক ভয়াবহ হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের প্রতিরোধকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’ (Press TV)-র এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হুথি আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যুরোর অন্যতম শীর্ষ প্রভাবশালী সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) এক বিশেষ বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রিয়াদের এই উসকানিমূলক ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, যার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই শ (২০০) মার্কিন ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। তেলের দামের এই আকাশচুম্বী বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধের যৌথ ছক ও সৌদি ভূখণ্ডে হামলার প্রস্তুতি
হুথি নেতা মোহাম্মদ আল-ফারাহ তাঁর বিবৃতিতে আরও বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি আরও জটিল আকার ধারণ করে, তবে আমরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব এবং হরমুজ প্রণালি সম্মিলিত ও যৌথভাবে বন্ধ করে দিতে দ্বিধা করব না।” এর পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করেন যে, সৌদি আরবের যেকোনো ধরনের নতুন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামরিক উপায়ে কঠোর ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার জন্য ইয়েমেনের রাজধানী সানার সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পরিস্থিতি বাধ্য করলে এবং সৌদি আরব হামলা বন্ধ না করলে এবার সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানা হবে বলেও হুথিদের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সানা বিমানবন্দরে হামলার তীব্র নিন্দা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
এর পাশাপাশি, ইয়েমেনের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সিনিয়র সদস্য মোহাম্মদ আলী আল-হুথি সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি জোটের সাম্প্রতিক বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। বেসামরিক বিমান লক্ষ্য করে চালানো এই হামলাকে তিনি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (International Humanitarian Law) চরম ও নগ্ন লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
এই ধ্বংসাত্মক হামলার পেছনে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবকে যৌথভাবে দায়ী করে মোহাম্মদ আলী আল-হুথি বলেন, “দীর্ঘদিনের আপেক্ষিক স্থবিরতা ও যুদ্ধবিরতির আবহের পর পুনরায় বিমানবন্দর ও সাধারণ বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে তারা আন্তর্জাতিক আদালতের দৃষ্টিতে নতুন করে যুদ্ধাপরাধ (War Crimes) করছে।”
১১ বছরের অবরোধ ভাঙার প্রত্যয়
এদিকে আনসারুল্লাহ (হুথি) আন্দোলনের অপর অন্যতম শীর্ষ নেতা আলী আল-কাহুম আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বিগত দীর্ঘ এগারো বছর ধরে ইয়েমেনের ওপর যে অমানবিক ও অবৈধ অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপ করে রাখা হয়েছে, তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার লড়াই হুথিরা যেকোনো মূল্যে অব্যাহত রাখবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সৌদি আরবকে তাদের এই চলমান উসকানিমূলক ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য নিকট ভবিষ্যতে অত্যন্ত ভয়াবহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে এবং এর জন্য রিয়াদকে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।” এই বিবৃতির পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম বৈশ্বিক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
