রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় সংসদ। এ উদ্দেশ্যে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) রাতে স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এই কমিটি গঠন করা হয়।
অধিবেশন চলাকালে সংসদ নেতা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম এই ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংসদীয় প্রথা ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দিলে তা বিপুল ভোটে পাস হয়।
১৭ সদস্যের কমিটি ছোট হলো বিরোধী দলের অসহযোগিতায়
সংসদীয় সূত্রে জানা গেছে, সংবিধান সংশোধনের মতো জাতীয় ও সংবেদনশীল বিষয়টিতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই বিশেষ কমিটি মূলত ১৭ সদস্যের করার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। সেই লক্ষ্যেই খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত তালিকায় বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তাদের পক্ষ থেকে পাঁচজন সংসদ সদস্যের (এমপি) নাম দেওয়ার জন্য চিফ হুইপের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
কিন্তু প্রধান বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে এবং কমিটির জন্য তাদের কোনো প্রতিনিধির নাম প্রস্তাব না করায় শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি আসন শূন্য রেখেই ১২ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস করতে হয়। বিরোধী দলের এই বর্জন ও অসহযোগিতার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১২ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে গঠিত এই বিশেষ কমিটিতে দেশের বর্তমান রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় ও আইন অঙ্গনের প্রথিতযশা সংসদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটির অন্য ১১ জন সম্মানিত সদস্য হলেন—
১. নূরুল ইসলাম (সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য)
২. মো. আসাদুজ্জামান (মাননীয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী)
৩. জয়নাল আবেদিন (বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবী)
৪. মীর হেলাল উদ্দিন (বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য)
৫. ফারজানা শারমিন (বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য)
৬. শাকিলা ফারজানা (বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য)
৭. মাহমুদুল হক (বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য)
৮. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য)
৯. আন্দালিব রহমান পার্থ (বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য)
১০. নুরুল হক নুর (গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য)
১১. মো. অলিউল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য)
রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য আনাই মূল লক্ষ্য
সংসদীয় নথিপত্র অনুযায়ী, নবগঠিত এই বিশেষ কমিটি বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা, সংসদের মেয়াদ, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন অংশীজন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করে একটি যুগোপযোগী ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যপূর্ণ সংবিধানের খসড়া তৈরি করবে।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জানান, “আমরা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পেয়েছি। বিরোধী দল নাম না দিলেও আমরা দেশের স্বার্থে একটি বৈষম্যহীন সংবিধান সংশোধনের রূপরেখা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদের টেবিলে জমা দিতে বদ্ধপরিকর।” কমিটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক কার্যনির্বাহী বৈঠকে বসবে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
