পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) কিশোরীকে (১৫) জোরপূর্বক ধর্ষণ চেষ্টার মতো একটি গুরুতর ও আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধকে দেশের প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার এক ন্যাক্কারজনক অভিযোগ উঠেছে। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্তকে আইনের হাতে সোপর্দ করার পরিবর্তে প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে মাত্র ‘২০টি জুতা পেটা’ করে বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে। আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে সালিশের মাধ্যমে এমন সংবেদনশীল ঘটনা নিষ্পত্তির জেরে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ এবং ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যার দিকে উপজেলার গৌরিগ্রাম ইউনিয়নের হাঁড়িয়াকাহন গ্রামে এই বেআইনি ও বিতর্কিত গ্রাম্য সালিশটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে একই দিন দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলার গৌরিগ্রাম এলাকার একটি বসতবাড়িতে এই ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত মহব্বত আলী খাঁ (৪৫) গৌরিগ্রাম এলাকার হাঁড়িয়াকাহন গ্রামের মৃত তায়জাল খাঁর ছেলে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ফাঁকা বাড়িতে একা পেয়ে নির্যাতন, হাতেনাতে আটক
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী কিশোরীর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রোববার দুপুরে ভুক্তভোগী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরীটিকে তার ঘরের ভেতর একা রেখে পরিবারের সদস্যরা জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। বাড়ি সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকার এই সুযোগে প্রতিবেশী মহব্বত আলী খাঁ অসৎ উদ্দেশ্যে ঘরের ভেতর অনধিকার প্রবেশ করেন এবং ওই প্রতিবন্ধী কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালান।
এ সময় কিশোরীটির গোঙানি ও আত্মচিৎকার শুনে পাশের বাড়ির লোকজন দ্রুত ছুটে আসেন এবং ঘরের ভেতর থেকে লম্পট মহব্বত আলীকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ঘটনার পর পরই এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয়রা অভিযুক্তকে আটকে রেখে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
আইনের তোয়াক্কা না করে বসলো সালিশ, ভিডিও ভাইরাল
ভুক্তভোগীর পরিবার সরাসরি থানায় গিয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নিলেও সন্ধ্যার দিকে এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী মাতব্বর ও স্থানীয় নেতা বিষয়টি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। তাঁরা ঘটনাটি পুলিশ প্রশাসনকে না জানানোর জন্য ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে রোববার সন্ধ্যার পর হাঁড়িয়াকাহন গ্রামে এক সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
সেই বেআইনি সালিশে প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে মহব্বত আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে সামাজিক ও শারীরিক শাস্তি হিসেবে গুনে গুনে মাত্র ‘২০টি জুতা পেটা’ করার রায় দেওয়া হয় এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার ও অভিযুক্ত পক্ষকে এই বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রকার থানা-পুলিশ বা আদালতে না যাওয়ার এবং কোনো ধরনের বিরোধে না জড়ানোর কড়া নির্দেশ দিয়ে পুরো ঘটনাটি জোরপূর্বক আপস-মীমাংসা করিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, সোমবার সকাল থেকে এই সালিশ বৈঠকের একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে পড়ে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, উপস্থিত শত শত মানুষের সামনে অভিযুক্ত মহব্বত আলীকে দাঁড় করিয়ে জুতা দিয়ে গুনে গুনে আঘাত করা হচ্ছে। একজন প্রতিবন্ধী নারীর ওপর হওয়া এমন অপরাধকে মাত্র ২০ জুতা পেটায় রফা করার এই ভিডিওটি দেখে নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং সালিশকারীদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি তুলছেন। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে সালিশ পরিচালনাকারী প্রধান প্রধান মাতব্বরদের সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি; ঘটনার পর থেকেই তারা গণমাধ্যমের আড়ালে রয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপের আশ্বাস
ধর্ষণচেষ্টার মতো একটি নন-কম্পাউন্ডেবল বা আইনের দৃষ্টিতে আপস-অযোগ্য গুরুতর অপরাধকে স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি করার বিষয়ে জানতে চাইলে সাঁথিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে বলেন, “উক্ত ঘটনাটি এখনো পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের অফিশিয়ালি বা লিখিতভাবে জানানো হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।”
তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, “বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যেকোনো ধরনের যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ চেষ্টার বিচার সালিশে করার কোনো আইনি বৈধতা নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ বা এজাহার পাওয়া মাত্রই আমরা মামলা রেকর্ড করব এবং অভিযুক্ত মহব্বত আলীসহ এই বেআইনি সালিশ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধেও তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পুলিশ এই বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল।”
