৩৩ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৯২ মিমি বৃষ্টি, নতুন বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কা

চলতি আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষাকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও অস্বাভাবিক আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে রেকর্ড ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর ঠিক আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছিল আরও ৯৭ মিলিমিটার। অর্থাৎ, মাত্র ৩৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকায় মোট ১৯২ মিলিমিটার তীব্র বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা পুরো জুলাই মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের অর্ধেকেরও বেশি।

আবহাওয়াবিদদের বরাতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এটি কোনো সাধারণ বা স্বাভাবিক মৌসুমী বৃষ্টিপাত নয়; বরং বায়ুমণ্ডলের দুটি ভিন্ন বায়ুপ্রবাহের বিরল ও শক্তিশালী সমন্বয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই অস্বাভাবিক বর্ষণের প্রভাবেই দেশজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে, উজান থেকে নেমে আসছে তীব্র পাহাড়ি ঢল এবং দেশের প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আরও নতুন নতুন বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সাথে পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড় বা ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

কেন এই অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত? আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যা

জলবায়ুর এই আকস্মিক ও তীব্র পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, “বর্তমানে দক্ষিণ এশীয় মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর অত্যন্ত সক্রিয় এবং শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। ঠিক একই সময়ে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শক্তিশালী পশ্চিমা লঘুচাপও দেশের ওপর তীব্র প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে পূর্ব দিক থেকে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র মৌসুমি বায়ু এবং পশ্চিম দিক থেকে আসা লঘুচাপজনিত শুষ্ক বায়ুপ্রবাহের পরস্পরের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ঘটছে। এই দুই বিপরীতমুখী বায়ুর মিলনে আকাশজুড়ে ঘন কালো ও দীর্ঘস্থায়ী মেঘমালার (Convective Clouds) সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশজুড়ে এই দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টিপাতের মূল কারণ।”

তিনি আরও জানান, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা এই আর্দ্র বাতাস যখন সিলেট ও চট্টগ্রামের উঁচু পাহাড়গুলোতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, তখন সেখানে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে তৈরি হচ্ছে প্রলয়ঙ্কারী পাহাড়ি ঢল।

সপ্তাহের শেষ দিকে স্বস্তির আভাস, তবে জুলাই জুড়েই থাকবে বৃষ্টি

আবহাওয়ার এই বৈরী আচরণ আরও কতদিন স্থায়ী হতে পারে—জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আরেক জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ খন্দকার হাফিজুর রহমান বলেন, “আগামী দুই থেকে তিন দিন এই ভারী বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সপ্তাহের শেষ দিকে এসে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সাময়িক, কারণ পুরো জুলাই মাস জুড়েই দেশজুড়ে থেমে থেমে বৃষ্টির এই উচ্চ প্রবণতা বজায় থাকবে। চলতি বছরে কেন স্বাভাবিকের চেয়ে এত বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত হতে আমাদের আরও কিছুদিন আবহাওয়া মণ্ডলের ডেটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বড় ধরনের বন্যা এবং দক্ষিণের পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক ভূমিধসের (Landslide) প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রসহ (FFWC) সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে ইতিমধ্যে আগাম সতর্ক বার্তা পাঠানো হয়েছে।”

বিপাকে নগর ও পার্বত্য অঞ্চল: ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার রেড অ্যালার্ট

টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এবং সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি রেড অ্যালার্ট বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে পৌঁছেছে। স্থানীয় প্রশাসনকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে বা আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, মাত্র ৩৩ ঘণ্টার এই জলবোমায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্পনগরীগুলোতে তীব্র জলাবদ্ধতা ও জলজটের সৃষ্টি হয়েছে। মূল সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সপ্তাহের শুরুর দিনগুলোতে রাজপথে যানবাহনের চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ তীব্র যানজট। সড়ক যোগাযোগ ও ট্রেন চলাচলেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটছে। ঢাকার নিম্নাঞ্চল ও বস্তি এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। আবহাওয়া অফিস সাধারণ জনগণকে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার এবং বজ্রপাতের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *