ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন: শেখ হাসিনা

রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তাঁর এই আকস্মিক ও বহুল আলোচিত বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ এবং বিগত দিনে বিএনপির দেওয়া ‘ঈদের পরে আন্দোলনের’ মতো অকার্যকর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সর্বশেষ গত শুক্রবার (১০ জুলাই ২০২৬) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সে (Reuters) প্রকাশিত এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই তাঁর দেশে ফেরার এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণের এই পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তিনি টেলিফোনের মাধ্যমে রয়টার্সকে এই সাক্ষাৎকার দেন। একই সঙ্গে সম্প্রতি ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি’ (NDTV)-কে দেওয়া এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারেও তিনি একই ধরনের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একাধিক অডিও কল রেকর্ড ভাইরাল হয়, যেখানে তাঁকে ‘যেকোনো সময় দেশে ঢোকার’ হুমকি দিতে শোনা গেছে।

কোন ডিসেম্বর? এটি বিএনপির ‘ঈদের পরে আন্দোলনের’ মতো: ড. নুরুল আমিন বেপারী

ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই রাজনৈতিক বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নুরুল আমিন বেপারী। দৈনিক রিপোর্টার বিডি-র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা বলেছেন তিনি ডিসেম্বরে আসবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন ডিসেম্বর? তিনি তো নির্দিষ্ট করে বলেননি যে এই ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই আসবেন, নাকি পরের কোনো ডিসেম্বরে। এটি মূলত ওই বিএনপির সাবেক আমলের ‘ঈদের পরে তীব্র আন্দোলন করব’ মার্কা ফাঁকা আওয়াজের মতোই শোনায়, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন, “রয়টার্স বা এনডিটিভির আগে তাঁর বহু অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে যেখানে তিনি কর্মীদের বলেছেন—‘আমি খুব কাছাকাছি আছি, আসতেছি’। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। তাই এবারের বলাটাকেও আমি কর্মীদের চাঙ্গা রাখার কৌশল বা পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি ছাড়া আর বেশি কিছু গুরুত্ব দিচ্ছি না।”

আন্তর্জাতিক সমর্থনহীনতা ও ফাঁসির আসামির আইনি ঝুঁকি

শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনি লড়াই লড়ার মতো ঝুঁকি নিতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী বলেন, “আমার মনে হয় এই ধরনের বড় ঝুঁকি নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সাহস বা নৈতিক শক্তি এখন আর শেখ হাসিনার নেই। কারণ, এ দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর সরকারের পতন ঘটেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিক পরাশক্তি বা লবিং এখন আর আওয়ামী লীগের পেছনে নেই। তদুপরি, দেশে এলে তিনি একজন সাজাপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাঁকে জেলখানার বিশেষ ড্রেস পরতে হবে এবং একজন সাধারণ কয়েদির মতোই ট্রিটমেন্ট বা আচরণ পাবেন। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সাহস তাঁর হবে না।”

ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে এই প্রবীণ শিক্ষাবিদ বলেন, “কিছুদিন পর দেখবেন ভারত নিজেই শেখ হাসিনাকে একটি বড় ‘রাজনৈতিক বোঝা’ মনে করা শুরু করবে। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্পষ্টতই চীনমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ যখন শুরু হবে, তখন ইন্ডিয়া চাইলেও আর আগের মতো একচেটিয়া প্রভাব খাটাতে পারবে না। তাই দিল্লিও এখন নতুন চিন্তাভাবনা করছে যে তারা শেখ হাসিনাকে আর কতটুকু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেবে। ফলে তাঁর এই বক্তব্য আসলে আওয়ামী লীগের হতাশ কর্মীদের মনে কৃত্রিম সাহস জোগানোর একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।”

জুলাইয়ের শক্তির ঐক্য ও আওয়ামী লীগের ‘ভোগবাদী’ চরিত্র

শেখ হাসিনা দেশে এলে তাঁর পক্ষে কোনো জনমত বা আন্দোলনের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না—এই বিষয়ে ড. নুরুল আমিন বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ নেই। তিনি যদি সত্যি দেশে আসেন, তবে মাঠের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সকল শক্তি মুহূর্তের মধ্যে এক প্ল্যাটফর্মে চলে আসবে। যেহেতু আওয়ামী লীগ এখন একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত দল, তাই তাদের কর্মীরা মাঠে নামার সাহসই পাবে না, উল্টো দেখামাত্রই গ্রেফতার হবে।”

আওয়ামী লীগের আন্দোলনমুখী হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি আরও বলেন, “গত ১৫-১৬ বছর একটানা ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিভাষায়, একবার বিপুল টাকার মালিক হয়ে গেলে সেই নেতাকর্মীরা আর রাজপথের কঠিন আন্দোলনে নামতে চায় না; তারা মূলত ‘ভোগবাদী’ বা সুবিধাবাদী বাহিনীতে পরিণত হয়। আমরা অতীতে বিএনপির ক্ষেত্রেও দেখেছি, ক্ষমতায় থাকার পর তাদের অনেক নেতাকর্মী ধনী হয়ে যাওয়ায় তারা আন্দোলন বেগবান করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাদের সাবেক বহু কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান ও নেতা বিপুল টাকা পাচার করে ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। ২৪-এর মতো আরেকটি সফল অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কেউ যদি তাদের প্লেটে করে ক্ষমতা তুলে দেয়, তবেই তারা বিদেশ থেকে আসবে; এর আগে কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামবে না।”

আইন ফাঁকি দেওয়া নেত্রীর আদালতে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ: ড. আইনুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামও ভারতের সেফ হাউজে থাকা শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে পুরোপুরি ‘রাজনৈতিক চাল’ বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, “এটি স্রেফ স্টান্টবাজি ও সস্তা রাজনীতি। তিনি যে সত্যি দেশে এসে আইনের আলোয় আত্মসমর্পণ করবেন, এমন কোনো সম্ভাবনা বা লক্ষণ রাজনৈতিক সমীকরণে দেখা যাচ্ছে না। মূলত দলের হতাশ ও ছন্নছাড়া কর্মীদের উজ্জীবিত রাখতেই তিনি এই ধরনের অবাস্তব আশ্বাস দিচ্ছেন।”

অধ্যাপক আইনুল ইসলাম আরও বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিন্তু শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করার জন্য এবং তাঁর বিচার নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কারণ তিনি যদি আসেন, তবে তাঁকে শত শত ছাত্র-জনতা হত্যার সুনির্দিষ্ট আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আর দেশের প্রচলিত কঠোর আইন ও শাস্তি থেকে বাঁচতেই তো ওনারা ৫ই আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। যে নেতৃত্ব নিজের অপরাধের আইনকে ফাঁকি দিতে রাষ্ট্র ছেড়ে পালায়, সে আবার আইন মোকাবেলা করার জন্য স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসবে—এমনটা ভাবা চরম হাস্যকর ও গভীর সন্দেহজনক।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *