মৌলভীবাজারের পর্যটন সমৃদ্ধ কমলগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৭ বছর পার হলেও স্যানিটেশন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘বর্জ্য শোধনাগার’ (Fecal Sludge Treatment Plant) প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। মূলত উপযুক্ত জায়গার অভাবেই ঝুলে রয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ। এর ফলে আধুনিক স্যানিটেশন সেবার আংশিক সুফল মিললেও সামগ্রিকভাবে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে। তবে পৌর প্রশাসনের দাবি, উপযুক্ত জমি পাওয়া গেলেই বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে।
৩৫ কোটির মেগা প্রকল্প, তবুও অধরা শতভাগ স্যানিটেশন
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ মিউনিসিপালিটি ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় কমলগঞ্জ পৌরসভায় পানি ও স্যানিটেশন খাতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে অর্জিত প্রধান সাফল্যগুলো হলো:
- পৌরবাসীর সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে ৬ লাখ লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশাল ওভারহেড জলাধার (ট্যাংক) নির্মাণ।
- পৌর এলাকায় ৩৫ কিলোমিটার পানি সরবরাহের পাইপলাইন স্থাপন এবং ৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন।
- ৩ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেনেজ নির্মাণ এবং সাড়ে তিনশ হাউজহোল্ডে (পরিবার) আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।
- পৌরবাসীর সুবিধার্থে কমলগঞ্জ উপজেলা চৌমুহনা ও ভানুগাছ বাজারে দুটি আধুনিক মানের পাবলিক টয়লেট নির্মাণ কাজ চলমান।
- পৌর এলাকার মানব বর্জ্য সংগ্রহ ও দ্রুত স্থানান্তরের সুবিধার্থে আধুনিক মানের দুটি অত্যাধুনিক ভ্যাকুয়াম (Vacuum Tanker) গাড়িও দেওয়া হয়েছে।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বেলাল চৌধুরী জানান, প্রকল্পের এই একটি মাত্র কাজ (বর্জ্য শোধনাগার) বাকি থাকলেও অন্যসব কাজ সম্পন্ন হওয়ায় পৌরবাসী ইতোমধ্যে সুপেয় পানি ও ড্রেনেজের ব্যাপক সুফল ভোগ করছেন।
এক একর খাস জমির সংকট, যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে মানব বর্জ্য
পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, সংগৃহীত মানব বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা পরিবেশসম্মত উপায়ে শোধনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শোধনাগার স্থাপন করা জরুরি, যার জন্য ন্যূনতম ১ একর জমির প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পৌর এলাকায় এই ১ একর উপযুক্ত খাস জমি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জমি সংকটের কারণে পুরো প্রকল্পের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আটকে রয়েছে।
এর ফলে পৌর এলাকার সুষ্ঠু ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী এম এ ওয়াহিদ রুলু ও রুমেলসহ একাধিক সচেতন পৌরবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বর্তমানে ভ্যাকুয়াম গাড়ি দিয়ে বিভিন্ন বাসাবাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে মানব বর্জ্য উত্তোলন করা হলেও শোধনাগার না থাকায় তা কোনো রকম শোধন ছাড়াই যত্রতত্র বা লোকালয়ের পাশে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পুরো ভানুগাছ বাজারের দৈনন্দিন উৎপাদিত টন টন ময়লা আবর্জনাও নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় যেখানে-সেখানে ফেলা হচ্ছে। এতে বৃষ্টির পানিতে বর্জ্য মিশে চারপাশের জলাশয়, ছড়া ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত নানা রোগ।
দ্রুত জমি খোঁজার আশ্বাস পৌর প্রশাসকের
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম শ্রেণীর এই কমলগঞ্জ পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ও পরিবেশগত সংকট দ্রুত সমাধানে সোচ্চার স্থানীয় বাসিন্দারা। এই বিষয়ে কমলগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, “আমরা বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য সক্রিয়ভাবে উপযুক্ত খাসজমি খুঁজছি। জমি পাওয়া মাত্রই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
