পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলসীমা হরমুজ প্রণালীতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরও এক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ইরানের অভ্যন্তরে নতুন করে বিমান হামলা পরিচালনা এবং দেশটির অপরিশোধিত তেল বিক্রির ওপর পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়ার সময় তিনটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের সাম্প্রতিক উসকানিমূলক হামলার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই শক্তিশালী পাল্টা বিমান হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য এই জলপথটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত করিডোর হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই উভয় বেঞ্চমার্কেই বড় লাফ
বুধবারের (৮ জুলাই) আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের উভয় প্রধান বেঞ্চমার্কেরই দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে:
- ব্রেন্ট ক্রুড (Brent Crude): আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১.৩৮ ডলার বা ১.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫.৫৪ ডলারে পৌঁছেছে।
- ডব্লিউটিআই ক্রুড (WTI Crude): একই সময়ে আমেরিকার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১.৩৭ ডলার বা ১.৯ শতাংশ বেড়ে ৭১.৮১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবারও ইরানি হামলার পর ওয়াশিংটন তেহরানের তেল বিক্রির সাধারণ লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে উভয় বেঞ্চমার্কের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। পরপর দুই দিনের এই ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ব্যয় আরও বেড়ে গেল।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ (২০ শতাংশ) এই একমাত্র হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হতো। বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর নিজেদের পূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে। তেহরানের পক্ষ থেকে ওমান উপকূলের আন্তর্জাতিক রুট পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের নিজস্ব উপকূলের কাছাকাছি নৌপথ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে আমেরিকার জোরালো দাবি, যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতোই এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথটি বিশ্বের সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত ও বাধাহীন রাখতে হবে।
কমছে আমেরিকার তেলের মজুত, অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা
যুদ্ধের শুরু থেকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ তাদের জরুরি কৌশলগত মজুত (Strategic Petroleum Reserves) থেকে তেল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারের সরবরাহ ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করে আসছে। তবে সেই সংকটও এখন ঘনীভূত হচ্ছে।
আমেরিকার পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (API) সর্বশেষ তথ্যের বরাতে বাজার সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত সপ্তাহেও আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেলের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ জরিপে জ্বালানি বিশ্লেষকেরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, গত ৩ জুলাই সমাপ্ত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের সামগ্রিক মজুত প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। মার্কিন মজুত কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার এই দ্বিমুখী সংকটে আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক তেলের বাজার আরও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
