দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তিনি বলেছেন, ভোজ্য তেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ, আটা ও চালসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি সহজীকরণ, শুল্ক ও করহার যৌক্তিকীকরণ এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুদদারি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২২তম কার্যদিবসে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ. কে. এম. ফজলুল হক মিলনের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সমন্বয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, মজুদ, সরবরাহ এবং মূল্য পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন দ্রুত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, আমদানিকারক এবং অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত পর্যালোচনা সভার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব বৈঠকের মাধ্যমে বাজারে সম্ভাব্য সংকট চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে দেশের বাজারে যাতে এর নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে এবং বিকল্প দেশ বা উৎস থেকে পণ্য আমদানির সুযোগও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ও করহার যৌক্তিকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজারে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে বা অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে, সেজন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়মিত বাজার তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জরিমানা ও অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তামূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের লাখো পরিবার বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যকর রাখতে সরকার সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। উৎপাদন থেকে শুরু করে আমদানি, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বাজার পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের চলমান এসব উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজার ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় সরকার ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই সরকারের তদারকি, সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখার উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে মূল্য নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার থাকলে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
