বৈশ্বিক সংকট সমাধানে একক শক্তি যথেষ্ট নয়: গুতেরেস

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বৈশ্বিক সংকটের গভীর ফাটলগুলো এখন ‘অতল খাদে’ পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে, শুধু সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে বিশ্বের সংকট সমাধান সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

দশ বছরের দায়িত্বকালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ৭৭ বছর বয়সী পর্তুগিজ এই কূটনীতিক বলেন, এ সময়ে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ও দীর্ঘায়িত হয়েছে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন মানবিক সহায়তাকর্মীরা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গুতেরেস বলেন, পরাশক্তিগুলোকে এখন বুঝতে হবে যে তাদের ক্ষমতা সীমাহীন নয়। কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা যায় না, অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না এবং প্রযুক্তিগত শক্তি একাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।

তিনি বলেন, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে এবং পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়েছে। জলবায়ু সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এমন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, যা এর নির্মাতাদেরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

গাজা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে তিনি এর আগে এমন পরিস্থিতি দেখেননি।

গুতেরেস আরও বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিভিন্ন ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ছে এবং আধিপত্যবাদী প্রবণতা বাড়ছে। বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ক্ষমতার কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হলেও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।

তার ভাষায়, রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ক্ষমতার একটি বড় অংশ গুটিকয়েক বেসরকারি করপোরেশন ও ধনকুবেরের হাতে চলে গেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ, প্রযুক্তি ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে মানুষ ক্রমেই প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব কোন পথে যাবে—সে প্রশ্নও তোলেন গুতেরেস। তিনি বলেন, বিশ্ব কি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সংকুচিত সহযোগিতার কারণে আরও বিভক্ত হবে, নাকি জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে এগোবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল পরীক্ষা হলো ক্ষমতা আইনের অধীনে পরিচালিত হবে, নাকি আইনের বাইরে। দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক সনদ রক্ষা এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে ‘অন্যায়’ উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন, নানা সমালোচনা ও তহবিল সংকটের মধ্যেও জাতিসংঘই এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে শক্তিশালী পক্ষগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।

ভাষণে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। গুতেরেস জানান, জাতিসংঘের ইতিহাসে এই প্রথম শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রধান কার্যালয় ও পেশাদার পদগুলোতে পুরুষের পাশাপাশি সমসংখ্যক নারী নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *