ট্রাম্পের গাজা শান্তির দাবিকে ম্যাক্রোঁর ‘লজ্জার প্রদর্শনী’ মন্তব্য

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গাজা যুদ্ধের অবসান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ট্রাম্প গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠাকে তাঁর প্রশাসনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ঘোষিত সেই শান্তির পরও গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। তিনি এ পরিস্থিতিকে ‘লজ্জার প্রদর্শনী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মঙ্গলবার জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, এক বছর আগে একই মঞ্চে প্রায় এক ডজন দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন অনেকে বলেছিলেন, স্বীকৃতি দেওয়া কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয়; বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তনই মূল বিষয়।

ম্যাক্রোঁ বলেন, গাজার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিষ্ক্রিয় থাকলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, কেউ কেউ গাজায় শান্তির কথা বলছেন, কিন্তু সেই শান্তির মধ্যেও মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার পুরোপুরি পুনঃস্থাপিত হয়নি।

ম্যাক্রোঁর এই বক্তব্য আসে ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পর। জাতিসংঘের একই মঞ্চে ট্রাম্প দাবি করেন, গত বছর গাজায় যুদ্ধ ভয়াবহ পর্যায়ে থাকলেও তাঁর প্রশাসনের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধের অবসান হয়েছে। এর ফলে ‘অসংখ্য’ মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ট্রাম্প আরও বলেন, সব জীবিত জিম্মিকে মুক্ত করা হয়েছে এবং নিহত জিম্মিদের মরদেহও স্বজনদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তাঁর ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে তিনি জানান, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ‘বোর্ড অব পিস’ নেতৃত্ব দেবে।

তবে ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের পর হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ট্রাম্প ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধ শেষ করেছেন, জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করেছেন এবং নিহত জিম্মিদের মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, গাজার ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ট্রাম্প নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ভাষণে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেন ম্যাক্রোঁ। সেখানে প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব কর্মকাণ্ড কার নামে হচ্ছে, কারণ পশ্চিম তীরে হামাস কখনো কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।

ম্যাক্রোঁর মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে। ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারকে সম্মান করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া থাকা উচিত, বর্তমান পরিস্থিতি সেটিকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্রান্স গত এক বছরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান জোরদার করেছে। দেশটি কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।

জাতিসংঘে নিজের শেষ ভাষণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও সতর্ক করেন ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেন, বিশ্ব এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে কি না, যেখানে শক্তি ও জবরদস্তিই নিয়ম নির্ধারণ করবে—নাকি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

জাতিসংঘের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বে দায়মুক্তির নতুন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা মেনে নেওয়া যায় না।

ভাষণের শেষে ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘দীর্ঘজীবী হোক জাতিসংঘ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *