যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শান্তি পরিকল্পনার ঘোষণার পরও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত রোববার ভোর থেকে গাজার বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু ও স্বাস্থ্য স্থাপনায় ইসরায়েলি বাহিনীর একাধিক বিমান ও ড্রোন হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল বিগত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ নিহতের ঘটনা।
এক নজরে রোববারের নারকীয় হামলা ও প্রাণহানি
হাসপাতাল ও স্থানীয় চিকিৎসকদের সূত্রে রোববারের হামলায় নিহতদের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
- পশ্চিম গাজা সিটির আল-সৌসি টাওয়ার: একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে বিমান হামলায় একই পরিবারের তিন সদস্য—৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তাঁর ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান এবং তাঁদের ৫ বছর বয়সী শিশুসন্তান আযযাম নিহত হন।
- খান ইউনিসের আল-কারারা এলাকা: বিমান হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য—৩৮ বছর বয়সী মাহমুদ আল-হামস, তাঁর ৩৭ বছর বয়সী স্ত্রী ফাতিমা ও তাঁদের কন্যাসন্তান নিহত হন।
- দেইর আল-বালাহ ও জাবালিয়া: দেইর আল-বালাহে নিজ বাড়িতে হামলায় ৬৮ বছর বয়সী কামু আবু মুয়াইলিক ও তাঁর স্ত্রী হুদা নিহত হন। আলাদা স্থানে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় দুই ভাই প্রাণ হারান। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সরাসরি চালানো হামলায় আরও একজন নিহত হন।
- বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু ও গাড়িতে হামলা: খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে হামলায় ১ জন, গাজা সিটির রেমাল এলাকায় ড্রোন হামলায় ২ জন এবং গাজা সিটিতে একটি সাধারণ গাড়িতে হামলায় আরও ৪ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
হাসপাতালের ওষুধের গুদামে বোমাবর্ষণ
হামলা কেবল আবাসিক ভবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; গত শনিবার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের প্রাঙ্গণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের গুদামেও ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। এতে দুটি প্রশাসনিক স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং দুটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধ ধ্বংস করার মাধ্যমে এখন চিকিৎসাসেবা ও রোগব্যাধিকেই যুদ্ধের নতুন অস্ত্রে পরিণত করছে ইসরায়েল।” উল্লেখ্য, গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজার বাসিন্দাদের কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা না দিয়ে নিচু দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়িয়ে এই নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
‘শান্তি পরিকল্পনা’ বনাম ইসরায়েলি গোঁয়ারতুমি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ জানায়, হামাস যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপের রূপরেখা গ্রহণে সম্মতি দিয়েছে। তবে ইসরায়েল এ বিষয়ে নীরবতা পালন করার পাশাপাশি প্রস্তাবিত চুক্তির কিছু সুনির্দিষ্ট ধারায় কড়া আপত্তি জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হামাস সম্পূর্ণ অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। অন্যদিকে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, “শান্তি আলোচনার সময় গাজায় আক্রমণ বন্ধ রাখার কোনো বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত নেই।”
| গাজা পরিস্থিতির এক নজরে পরিসংখ্যান (২০২৫ অক্টোবর – ২০২৬ আগস্ট) |
| মোট নিহত ফিলিস্তিনি: ১,২২২ জন+ |
| মোট আহত ফিলিস্তিনি: ৪,০৫৩ জন+ |
| সর্বশেষ একদিনে নিহত (৩ আগস্ট): ১৯ জন (অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ) |
| ক্ষতিগ্রস্ত মূল অবকাঠামো: আবাসিক টাওয়ার, তাঁবু ও আল-আকসা হাসপাতালের ওষুধের গুদাম |
হামাস অভিযোগ করেছে যে, গাজায় প্রস্তাবিত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দিতেই ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা বাড়িয়েছে। সংগঠনটি মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতি ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াবার জোর আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে গাজার দায়িত্বে থাকা বোর্ড অব পিসের প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মধ্যস্থতাকারীরা এখনো নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
