নেপালে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে নিহত ৩, শান্ত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ভারতের সীমান্তবর্তী নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে হঠাৎ করেই ব্যাপক ধর্মীয় উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় গুলিবর্ষণে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া এড়াতে সরকার ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে কঠোর কার্ফিউ জারি করেছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চরম দেশবাসীকে শান্ত থাকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিশেষ আকুল আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।

আজ শুক্রবার (৩১ জুলাই ২০২৬) কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর ঘটনার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।

উচ্চস্বরে গান ও ধর্মীয় পতাকা ঘিরে সহিংসতার সূত্রপাত

স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার ভারতীয় সীমান্তের কাছে নেপালের সুনসারি জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় মিছিল বা শোভাযাত্রা যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে গান বাজানো এবং ধর্মীয় পতাকা বহনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও বিবাদের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সেই বাকবিতণ্ডা দ্রুতই দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সহিংসতায় রূপ নেয়।

নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফল জানান, খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই পক্ষের সহিংস জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে চরম পন্থায় গুলি চালাতে বাধ্য হয়। পুলিশের সেই গুলিবর্ষণে দুইজনের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে উঠলে প্রশাসন পুরো এলাকায় কার্ফিউ জারি করে। তবে কার্ফিউ বহাল থাকা সত্ত্বেও গতকাল বৃহস্পতিবার পার্শ্ববর্তী সিরাহা জেলায় নতুন করে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হলে সেখানেও সহিংসতায় আরও একজন নিহত হন। এতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনজনে।

নীরবতা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ

চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কাঠমান্ডুর সাবেক এই মেয়র বালেন্দ্র শাহকে জাতীয় ইস্যুতে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তবে দক্ষিণাঞ্চলের এই অনভিপ্রেত ধর্মীয় সহিংসতায় নীরবতা ভেঙে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশ্যে নিজের প্রথম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে দেশের জনগণকে দায়িত্বশীল আচরণ করার এবং দ্রুত ‘অশান্তির মেঘ সরাতে’ সরকারকে সহায়তা করার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়।

বালেন্দ্র শাহ বলেন, “আমি সরকারের পক্ষ থেকে দেশের সর্বস্তরের নাগরিক, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রদায়, সম্মানিত ধর্মগুরু, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতি সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের অনুনয় করছি। আমাদের সবসময় শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে।”

নেপালের প্রধানমন্ত্রী এই দুঃখজনক ঘটনার সার্বিক বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সাথে কোনো পক্ষকে না ছাড় দিয়ে এই ঘটনার পেছনে উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে বলেও কঠোর বার্তা দেন তিনি।

সীমান্ত ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে চরম সতর্কতা

সহিংসতা ও নতুন করে সংঘর্ষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নেপাল কর্তৃপক্ষ বর্তমানে সুনসারি ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফিউ বজায় রেখেছে।

পুলিশ মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফল বলেন, “আমরা পুরো দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে মাঠে থাকা সকল পুলিশ সদস্য ও বিশেষ বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছি। ন্যূনতম বল প্রয়োগ করে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন করে যেকোনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি কঠোরভাবে প্রতিরোধের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”

উল্লেখ্য, হিমালয় কন্যা নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সমতল ভূমিতে (তরাই অঞ্চল) ঐতিহাসিকভাবেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *