মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাটিতে ইরানের অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার চেষ্টার জবাবে দেশটির বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই বিধ্বংসী হামলা চালানো হয়।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, জর্দানে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ঘাঁটি এবং বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে সম্প্রতি ইরানের চালানো হামলার সরাসরি জবাব হিসেবেই এই প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
কেশম দ্বীপে শিশুসহ নিহত ৩, আবদানেও হামলা
যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করলেও ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত কেশম দ্বীপে চরম সাধারণ নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ জানায়, কেশমের চাহ তাঙ্গু এলাকার একটি সাধারণ আবাসিক বাড়িতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ঘটনাস্থলেই এক দম্পতি ও তাঁদের দুই বছর বয়সী শিশু সন্তান নিহত হন। এ ছাড়া ইরানের তেল শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেশম ও আবদান অঞ্চলসহ দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মার্কিন বোমারু বিমানের হামলার শিকার হয়েছে।
মার্কিন সেন্টকমের বক্তব্য ও আইআরজিসির দাবি
সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় সময় বুধবার রাতে চালানো এই হামলায় মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল:
- আইআরজিসির প্রধান কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার
- ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক ড্রোন তৈরির গোপন আস্তানা
- উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং নৌ-সক্ষমতা সংক্রান্ত মূল অবকাঠামো
মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরান থেকে জর্দানে মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে যেসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, তার সবকটিই আকাশে সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আইআরজিসি মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে যে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে তারা জর্দানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত বিমানঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টারে নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করার অভিযোগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী তিনটি তেলবাহী জাহাজেও সফল হামলা চালিয়েছে তারা।
মিসরে ড্রোন হামলা ও অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
চলমান এই ভয়াবহ যুদ্ধের উত্তাপ এবার মিসরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কায়রো সরকার জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে রহস্যজনক অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটে, যা মূলত ড্রোন হামলার কারণে সংঘটিত হয়েছে। চলমান এই আঞ্চলিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ মিসরে এ ধরণের সরাসরি হামলার ঘটনা এটিই প্রথম।
পূর্বে ঘোষিত ১৩ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্থগিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্দানে ইরানি হামলার চেষ্টার পর পাল্টা প্রতিশোধের ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে—সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সাথে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা আর বাড়াতে চায় না।
এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরাকে ইরান-সমর্থিত শিয়া গোষ্ঠী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (PMF)-এর ওপর বিমান হামলা চালায়, যাতে অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত হন। ইরাকি প্রেসিডেন্সি এই হামলাকে নিজেদের দেশের সার্বভৌমত্বের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে তীব্র নিন্দা জানালেও ট্রাম্পের দাবি—উক্ত হামলাটি ইরাক সরকারের সমন্বয় ও সম্মতিতেই চালানো হয়েছে।
