ইরানের হামলায় কি রাশিয়ার গোপন সহায়তা? নতুন গোয়েন্দা তথ্য ঘিরে বাড়ছে আন্তর্জাতিক জল্পনা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়ার সম্ভাব্য গোপন ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের কিছু উচ্চ-নির্ভুল সামরিক হামলার পেছনে রাশিয়ার গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা থাকতে পারে। যদিও মস্কো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও বিষয়টি নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের (আসিয়ান) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বৈঠকও এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং ইরান–রাশিয়া সামরিক সহযোগিতাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের হামলায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কিছু স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের অভ্যন্তরে থাকা একটি সিআইএ স্টেশনে ড্রোন হামলার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনার অবস্থান শনাক্ত করতে রাশিয়া ইরানকে সহায়তা করেছে বলেও একাধিক আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর নির্ভুলতা এবং লক্ষ্যবস্তুর সঠিক অবস্থান নির্ধারণের সক্ষমতা দেখে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত করছেন। তাঁদের ধারণা, উন্নত স্যাটেলাইট নজরদারি ও সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে ইরান অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে থাকতে পারে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেভস্কি মনে করেন, এ ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা বাস্তবসম্মত। তাঁর মতে, ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় উন্নত লক্ষ্য নির্ধারণে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কও অত্যন্ত কার্যকর এবং হামলার পরিকল্পনায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এর ধারাবাহিকতায় দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়া ‘কোমেটা-এম’ নামের একটি অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন প্রযুক্তি ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে সংযুক্ত করতে সহায়তা করেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তি ড্রোনের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে রাশিয়া এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ‘ভুয়া তথ্য’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানোর পর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করেছে। সংঘাতের এই বিস্তার পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার সম্ভাব্য সহায়তা থাকলেও যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের কার্যক্রমের প্রধান ভিত্তি তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোয়েন্দা অবকাঠামোই ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি। রাশিয়ার সহযোগিতা থাকলেও তা মূল সক্ষমতার পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে রাশিয়া। কারণ এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে কিছুটা সরে যেতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক ফ্রন্টে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে ইরানের জন্যও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক তদন্ত ও কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *