মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ বাহিনীর মধ্যকার চলমান সংঘাত এক নতুন ও চরম বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। জর্ডানের অভিমুখে ধেয়ে আসা ইরানের ১০টি শক্তিশালী ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশেই সফলভাবে ধ্বংস ও প্রতিহত করেছে দেশটির রাজকীয় বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট (Air Defence Unit)। আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) ভোরের দিকে জর্ডান সীমান্তে এই বিশেষ ও সফল সামরিক প্রতিরক্ষা অভিযান চালানো হয়। জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাঝআকাশে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার কারণে দেশের অভ্যন্তরে কোনো নাগরিক হতাহত হননি এবং কোনো রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
জর্ডানের সামরিক বাহিনীর একজন অত্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, নিজস্ব আকাশসীমা সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা এবং সর্বসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অংশ হিসেবেই এই সফল প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংসের পরপরই জর্ডানের ‘রয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পস’-এর (Royal Engineering Corps) বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ও উদ্ধারকারী দল জর্ডানের বিভিন্ন মরুভূমি ও জনপদে পড়া রকেটের ধ্বংসাবশেষ ও জ্বলন্ত টুকরোগুলো সংগ্রহ করতে মাঠে নেমেছে এবং নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে ওই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে সিলগালা ও সুরক্ষিত করেছে।
কুয়েত থেকে সিরিয়া: একযোগে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা
এর আগে গত শুক্রবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের (IRGC) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছিল যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, ওমান, সিরিয়া, জর্ডান এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবকটি কৌশলগত সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে বড় ধরনের ও নজিরবিহীন প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে। তেহরানের সামরিক কমান্ডের দাবি অনুযায়ী, তাদের ছোঁড়া নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র ও ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটি, অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং অনেকগুলো সামরিক যুদ্ধবিমান মারাত্মকভাবে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের এই মহাবিপর্যয়কর হামলার দাবির প্রেক্ষিতে কুয়েত, জর্ডান এবং বাহরাইন সামরিক প্রশাসন পৃথক পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তাদের উচ্চ প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো নিজস্ব আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো সফলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে কাতার প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে যে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীও বেশ কয়েকটি আকাশপথের হামলা নস্যাৎ করেছে, তবে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পর নিচে পড়া স্প্লিন্টার বা জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের আঘাতে কাতারে এক শিশু আহত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন করে যুদ্ধ: ব্যর্থ সমঝোতা
প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি (২০২৬) মাস থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ড ও পরমাণু স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এই আঞ্চলিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে। যার দাঁতভাঙা জবাব হিসেবে তেহরানও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনাকারী ও আশ্রয় দেওয়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে একযোগে এই পাল্টা হামলা চালায়।
যদিও বিগত জুন মাসে চিরবৈরী পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’র (Strait of Hormuz) একক সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পুনরায় তীব্র পাল্টাপাল্টি আকাশ ও নৌযুদ্ধ শুরু হয়েছে। জর্ডানের আকাশে এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকেরা।
