কাপ্তাই বাঁধের ১৬ স্পিলওয়ে গেট খুলে দেওয়া হলো, কর্ণফুলী তীরের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান

টানা বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাঁধের উজান ও ভাটি এলাকার সার্বিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হ্রদের প্রধান স্পিলওয়ের (পানি নির্গমন পথ) ১৬টি গেট বা জলকপাট একযোগে খুলে দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) সকাল ১১টা ২০ মিনিটে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জলকপাটগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে ৬ ইঞ্চি করে উন্মুক্ত করে দেয়। এর ফলে প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক ৯ হাজার কিউসেক পানি কাপ্তাই হ্রদ থেকে সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে আছড়ে পড়ছে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে জানান, আজ শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১০৪ দশমিক ০৮ এমএসএল (মিন সি লেভেল)। যেখানে এই ঐতিহাসিক বাঁধটির সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতা বা শেষ সীমা হচ্ছে ১০৯ ফুট এমএসএল।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “রাঙামাটি ও আশপাশের এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয় বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও ভারতের মিজোরাম ও পার্বত্য উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের (ইনফ্লো) কারণে হ্রদের পানি হু হু করে বাড়ছে। হ্রদের পানি যাতে কোনোভাবেই চূড়ান্ত বিপৎসীমা স্পর্শ করতে না পারে, তার আগেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বাঁধের সুরক্ষার্থে স্পিলওয়ের গেটগুলো খুলে দেওয়ার এই জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ: পরিস্থিতি ভেদে বাড়তে পারে গেটের উচ্চতা

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, হ্রদের বর্তমান পানির উচ্চতা, উজান থেকে আসা পানির প্রতি মুহূর্তের প্রবাহ এবং আবহাওয়া দপ্তরের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস সার্বক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আপাতত গেটগুলো ৬ ইঞ্চি পরিমাণ খোলা হলেও, উজান থেকে পানির অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবাহ যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তবে পর্যায়ক্রমে গেটগুলো আরও উঁচুতে খুলে পানি নিষ্কাশনের পরিমাণ বহুগুণ বাড়ানো হবে।

এদিকে, হ্রদে পর্যাপ্ত পানির প্রাপ্যতা থাকায় বর্তমানে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটই পুরোদমে ও পূর্ণ শক্তিতে চালু রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই পাঁচটি সচল ইউনিটের মাধ্যমে বর্তমানে ২২২ মেগাওয়াট (সর্বোচ্চ ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট) পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে আরও প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি হ্রদ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্কাশিত হচ্ছে। ফলে স্পিলওয়ে ও বিদ্যুৎ উৎপাদন— দুই পথ মিলিয়ে কর্ণফুলী নদীতে বিপুল পরিমাণ পানির প্রবাহ তৈরি হয়েছে।

কর্ণফুলী তীরবর্তী অঞ্চলে হাই-অ্যালার্ট ও সতর্কতা জারি

স্পিলওয়ের ১৬টি গেট একসাথে খুলে দেওয়ায় কর্ণফুলী নদীতে পানির প্রবাহ ও স্রোতের তীব্রতা হঠাৎ করেই প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাঙামাটি, কাপ্তাই এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানসহ নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এলাকার বাসিন্দা, নৌযান চালক, সাধারণ জেলে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বনের জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি নৌকা বা ট্রলার নিয়ে নদীতে মাছ ধরা এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে মূলত ১৯৫৬ সালে এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ তৈরির মেগা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শেষ হয়। এই বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি বিশাল স্পিলওয়ে রয়েছে, যা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফিট পানি বের করে দেওয়া সম্ভব। শুরুতে মাত্র দুটি ইউনিটের মাধ্যমে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও, আধুনিকায়নের পর বর্তমানে পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *