চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে ধরতে ফটিকছড়িতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের অন্যতম আলোচিত, দুর্ধর্ষ ও চাঞ্চল্যকর একাধিক হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করতে ফটিকছড়ি উপজেলায় এক বিশাল ও নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে জেলা পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) সকাল থেকে ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের একজন অত্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে অভিযানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায় ডেভিড ইমনের সম্ভাব্য সব আস্তানায় জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অভিযানের শুরুতে ইমনের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মোবাইল ফোন পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়। এরপর ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হয়। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ডেভিড ইমন এখনো পুলিশের নাগালের বাইরে রয়েছে।

ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত ‘বড় সাজ্জাদে’র প্রধান সহযোগী এই ইমন

পুলিশ ও চট্টগ্রামের স্থানীয় অপরাধী চক্রের সূত্র থেকে জানা যায়, ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা মো. মুসার ছেলে ডেভিড ইমন মূলত আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের (Interpol) তালিকাভুক্ত এবং বর্তমানে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর (যিনি অপরাধ জগতে ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত) অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী। দীর্ঘদিন ধরে এই ডেভিড ইমন বিদেশে পলাতক সাজ্জাদের নাম ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্প গ্রুপ ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের বাকলিয়ার বহুল আলোচিত জোড়া খুন এবং পতেঙ্গায় সংঘটিত ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলা রয়েছে।

২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে পৈশাচিক হামলা

পুলিশ জানায়, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে এই তাৎক্ষণিক সাঁড়াশি অভিযানের মূল কারণ গত সোমবারের (১৩ জুলাই) একটি পৈশাচিক ও দুঃসাহসিক সন্ত্রাসী হামলা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামক একটি স্বনামধন্য ইন্টারনেট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে রেকারিং চাঁদা দাবি করে ডেভিড ইমন।

কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মালিক এই বিপুল পরিমাণ চাঁদা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানানোয়, গত সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরের দিকে ২০-২৫ জনের একটি ভারী ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রাসী দল প্রকাশ্য দিবালোকে চকবাজারের ওই ইন্টারনেট অফিসে আকস্মিক হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা ক্যাশ বক্স থেকে লুট করে নিয়ে যায়। এই নৃশংস হামলার একটি অডিও রেকর্ড ও সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয় এবং পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও আইন শৃঙ্খলার অবনতির সৃষ্টি করে।

মাঠে নেমেছে জেলা পুলিশের বিশেষ টিম

ইন্টারনেট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে হামলা ও কোটি টাকা চাঁদা দাবির এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ভোর থেকেই নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের নিজ এলাকা ফটিকছড়ির কাঞ্চন নগরে তার অবস্থান শনাক্ত করে মাঠে নামে জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “ডেভিড ইমন ও তার পেটোয়া বাহিনীর এই দুঃসাহসিক অপরাধ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। পুরো কাঞ্চননগর এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে এবং সম্ভাব্য সব প্রবেশ ও বাহির পথ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ইমনকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামে তার পুরো চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত এই সাঁড়াশি অভিযান কোনোভাবেই বন্ধ হবে না।” এই অভিযানকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়ি ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উত্তেজনা ও স্বস্তি বিরাজ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *