সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, “তার (শেখ হাসিনা) যদি ন্যূনতম লজ্জা ও ব্যক্তিত্ব থাকত, তবে এই মুখ দেখানো তো দূরের কথা, নিজে ভারতে গিয়ে আত্মহত্যা করতেন।” তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো স্বৈরাচারের পতন হওয়ার পর কেউ কোনোদিন ফিরে আসেনি। এই বাংলার ইতিহাসেও বিগত ৮০০ বছরের মধ্যে শেখ হাসিনার মতো লজ্জাজনকভাবে আর কেউ কখনো পালিয়ে যায়নি।
শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে এনসিপি আয়োজিত ‘জুলাই পদযাত্রা’র সমাপনী সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে সারজিস আলম এসব কথা বলেন।
স্বৈরাচারের বীজ ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
সমাবেশে ইতিহাসের খতিয়ান তুলে ধরে সারজিস আলম বলেন, “বাংলার ইতিহাসে সর্বশেষ লক্ষণ সেন পালিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি কোনোদিন ফিরে আসেননি। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি বা ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশরাও এত লজ্জাজনকভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি।” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত ২৩ বছরে শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৭২ থেকে ৭৫-এ তিনি ধীরে ধীরে স্বৈরাচারের বীজ বপন করা শুরু করেন। বাংলাদেশে প্রথম স্বৈরাচারের বীজ ৭২-এর ১০ জানুয়ারিতেই বপন করা হয়েছিল।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, “২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোকে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করত। কোন সংবাদ যাবে আর কোনটা যাবে না, কোনটা আওয়ামী লীগের পক্ষে সাফাই গাইবে—সব শেখ হাসিনা ও তার পেটোয়া বাহিনী স্ক্রিপ্ট লিখে দিত। মিডিয়াকে ব্যবহার করে দাড়ি-টুপিধারী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জোরপূর্বক জঙ্গিবাদ হিসেবে ফ্রেমিং করা হতো, যার কারণে মানুষ দাড়ি-টুপি রাখতে শঙ্কাবোধ করত।”
তিনি বর্তমান পরিস্থিতির দিকে আঙুল তুলে বলেন, “অভ্যুত্থানের পর কিছুদিন মিডিয়াকে ঠিকঠাক পেলেও, এখন আবার মূল গদিতে বসে থাকা ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা সত্য সংবাদ প্রচারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরা ঠিকমতো মাসের বেতন পাচ্ছেন না। এভাবে একটি দেশের স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কোনোদিন বিকশিত হতে পারে না।”
নির্বাচিত বিএনপি সরকারের লুটপাট ও চাঁদাবাজির তীব্র সমালোচনা
বক্তব্যের একপর্যায়ে বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন সারজিস আলম। তিনি বলেন, “একটা নির্বাচিত বিএনপি সরকার এসেছে, আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আপনারা লক্ষ্য করেন, বিগত সাড়ে চার মাসে যত ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও কার্ড এসেছে, সব কিছু বিএনপির নেতা-খেতাদের মাধ্যমে শুধু তাদের ভোটারদের দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি কি শুধু বিএনপির সরকার, নাকি এই বাংলাদেশের সরকার?”
এলাকায় চলমান বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাস্তার টেন্ডার দেওয়ার আগে বা ইঞ্জিনিয়ার কাজ শুরু করার আগে ওই এলাকার কিছু নেতা-খেতাকে আগে ভাগ বা টাকা বুঝিয়ে দিতে হয়। এই উপজেলায় হয়তো ৫ বা ১০ জন বিএনপির লোক এই ধরনের ধান্দাবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও মাদক কারবারিদের শেল্টার দিচ্ছে। কিন্তু তাদের জন্য বাকি হাজার হাজার লোক দুর্নাম কেন নেবে?”
বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে সারজিস আলম বলেন, “ক্ষমতায় আজকে আছেন, কালকে নাই। মনে রাখবেন, আপনার সন্তান যে স্কুলে যায়, সেই ম্যানেজিং কমিটি যদি স্কুলের টাকা চুরি করে, তবে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎও শেষ হয়ে যাবে। তাই চাঁদাবাজ, দখলবাজ ও মাদককারবারি যে দলেরই হোক না কেন, তাদের দলমতনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।” সমাবেশে এনসিপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
