শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর, প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষার আশ্বাস

রাজধানীসহ দেশজুড়ে চলমান তীব্র শিক্ষার্থী আন্দোলন ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের আল্টিমেটামের মধ্যেই এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। চলমান বন্যা পরিস্থিতি ও দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে উদ্ভূত জটিলতায় শিক্ষার্থীদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তাদের যার যার পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সাথে দেশের বন্যাদুর্গত যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে পানি ওঠার কারণে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তদন্ত সাপেক্ষে সেখানে পুনরায় পরীক্ষা (রি-এক্সামিন) নেওয়ার স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে স্পিকারের উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এই আশ্বাস ও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে মন্ত্রণালয়, প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা

সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “চলতি বর্ষা ও বন্যা মৌসুমের মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিয়ে আমাদের সকলেই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি প্রতিনিয়ত ‘কনস্ট্যান্ট মনিটরিং’ (Constant Monitoring)-এ রেখেছি এবং এখনও রাখছি। সারাদিনই আমাদের পুরো টিম এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করে থাকে।”

বন্যাদুর্গত এলাকার কেন্দ্র পরিবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, “মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, যদি পরীক্ষার কোনও কেন্দ্রে পানি উঠে থাকে, তবে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র সরিয়ে নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়েছি। লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে এই বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ যাবত শুধু একটি কলেজ—কুমিল্লা সরকারি কলেজের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় সমস্যা ছিল। সেই কলেজের মাঠটা পুরোপুরি পানিতে ভরে গিয়েছিল। তাছাড়া অন্যান্য যেসব গুটিকয়েক জায়গায় পানি উঠেছে, সেখানে পানি তেমন একটা বেশি নয় এবং আমরা সাথে সাথেই কেন্দ্র পরিবর্তন করার ব্যবস্থা করেছি।”

শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের যে ধরনের লজিস্টিক ও নীতিগত সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন, তার সবটুকুই দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত মনিটরিং করে এই কাজগুলো করছি। সেই ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, দুর্যোগের কারণে যেসব পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া বা বিষয়টির সমাধান করা আমাদের জন্য কোনও বিরাট বা কঠিন কাজ নয়। কারণ অতীতেও আমরা অনেক জায়গায় বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা বন্ধ করেছি এবং আমাদের কাছে বিকল্প ‘কোশ্চেন সেট’ (প্রশ্নপত্র) প্রস্তুত রয়েছে। আমরা খুব দ্রুতই দুর্যোগের কারণে বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নেব।”

চট্টগ্রাম বোর্ডে বিশেষ ব্যবস্থা, বঞ্চিত করা হবে না ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আরও বলেন, “আমরা পুরো পরিস্থিতি আবারও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছি। যদি দেশের কোথাও আমাদের স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা বা দুর্বলতার কারণে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠার পর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে না পেরে থাকে—তবে সেই সুনির্দিষ্ট জরিপ ও তথ্য আমাদের হাতে আসার সাথে সাথেই পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। আমরা ইতিমধ্যেই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে (Chittagong Board) বন্যা পরিস্থিতির কারণে এই বিশেষ ব্যবস্থাটি গ্রহণ করেছি এবং সামগ্রিকভাবে সেই অবস্থান আমাদের এখনও রয়েছে।”

রাজধানীর সায়েন্সল্যাবে আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমি শিক্ষার্থীদের প্রতি আবারও বিনীত অনুরোধ করবো—তোমরা যার যার পড়ার টেবিলে ফিরে যাও। তোমাদের চেয়ে এই পরীক্ষা নিয়ে আমরাই বেশি উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থীদের চেয়ে আমাদের উদ্বেগ বেশি এ কারণে যে, কীভাবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে তাদের পরীক্ষা সঠিকভাবে ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায়।”

তিনি মহান সংসদের মাধ্যমে পুরো জাতিকে আশ্বস্ত করে বলেন, “আমি আবারও দেশের ছাত্রসমাজ ও অভিভাবকদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভুল ত্রুটি হয়েছে, সেখানে রি-এক্সামিন (পুনরায় পরীক্ষা) নেওয়ার পর্যাপ্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভিশন আমাদের রয়েছে। এই পরীক্ষার্থীরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। এদেরকে আমরা কোনও অবস্থাতেই বঞ্চিত (ডিপ্রাইভ) করতে পারি না এবং করবোও না। সেটাই আমি আজ মহান সংসদের মাধ্যমে পুরো জাতিকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানাতে চাচ্ছি।” শিক্ষামন্ত্রীর এই নমনীয় ও আশ্বাসমূলক বক্তব্যের পর মাঠপর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া কী হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *