২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বড় পরীক্ষার অপেক্ষা

মধ্যপ্রাচ্যের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দীর্ঘস্থায়ী গাজা যুদ্ধের আবহের মধ্যেই আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলের সংসদ ‘নেসেট’ (Knesset)। রোববার সংসদের তরফ থেকে এই নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিতর্কিত নেতৃত্ব, যুদ্ধ পরিচালনা এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্যের ওপর দেশটির জনগণের এটিই হবে প্রথম সরাসরি ও চূড়ান্ত রায়।

সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী শুক্রবার বর্তমান নেসেটের শেষ বা সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর-ডানপন্থী জোট সরকার সাফল্যের সঙ্গে টানা চার বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে। ইসরায়েলের বিগত প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো সরকার, যা মাঝপথে ভেঙে না গিয়ে বা আগাম নির্বাচনের মুখে না পড়ে সম্পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করার এক বিরল নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে।

সংসদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের ঘোষণা

ইসরায়েলের সংসদ নেসেট এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে, “বর্তমান সংসদ তার চার বছরের আইনি মেয়াদ পূর্ণ করবে বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের বিদ্যমান নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, আগামী সাধারণ নির্বাচন ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যেহেতু সংসদের মেয়াদ কমানোর বা আগাম নির্বাচন ডাকার কোনো পরিকল্পনা কিংবা প্রয়োজনীয়তা এই মুহূর্তে নেই, তাই নেসেট বিলুপ্ত করার জন্য আলাদা কোনো বিশেষ আইন পাস করারও প্রয়োজন পড়ছে না।”

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন থাকা লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত জুন মাসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি আগামী নির্বাচনে আবারও পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন নজিরবিহীন আল-আকসা ফ্লাড অভিযানের পর থেকেই তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি রয়েছেন। সমালোচকদের দাবি, নেতানিয়াহু সরকারের চরম গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতার কারণেই গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের তথাকথিত অভেদ্য ও অত্যাধুনিক সীমান্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বা ‘স্মার্ট ফেন্স’ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে ২৫১ জনকে জিম্মি করতে সক্ষম হয়েছিল।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা: জনমত জরিপে আইজেনকোটের উত্থান

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাটকীয়ভাবে আবির্ভূত হয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। ইসরায়েলি প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১৩’ (Channel 13)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াশার পার্টি’ জনপ্রিয়তার বিচারে সামান্য ব্যবধানে হলেও নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ পার্টি’র চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

উল্লেখ্য, গাদি আইজেনকোট যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গঠিত নেতানিয়াহুর বিশেষ যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার (War Cabinet) একজন অন্যতম শীর্ষ সদস্য ছিলেন। তবে গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা এবং জিম্মিদের মুক্ত করতে না পারার তীব্র ক্ষোভ থেকে তিনি ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও এই যুদ্ধের বড় আঘাত সয়েছেন তিনি; ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় স্থল অভিযান চলাকালীন তাঁর নিজের ছেলে নিহত হন।

যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির মামলার কালো ছায়া

শুক্রবার সংসদ অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত হওয়ার আগে নিজের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে তড়িঘড়ি করে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিল পাস করিয়ে নিতে চাইছে নেতানিয়াহু সরকার। যার মধ্যে রয়েছে দেশের বিচার বিভাগ সংস্কারসংক্রান্ত আইন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অংশ না নেওয়া অতি-গোঁড়া (আল্ট্রা-অর্থোডক্স) ইহুদিদের বিরুদ্ধে জারি করা আটকাদেশ স্থগিত করার একটি বিশেষ বিল। নেতানিয়াহু আশা করছেন, এই আইনগুলো তাঁর কট্টরপন্থী ধর্মীয় জোটের ভোট ব্যাংক রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

বিপরীতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধীরা এবং সাধারণ বিক্ষোভকারীরা মনে করেন, গাজা যুদ্ধ দীর্ঘ তিন বছর ধরে টেনে নেওয়ার পরও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারা প্রমাণ করে যে, নেতানিয়াহু আর প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য উপযুক্ত নন। একই সময়ে, জাতিসংঘের আদালতসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার সামরিক অভিযান ও বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ (Genocide)-র শামিল বলে অভিহিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে একঘরে করে ফেলেছে। তদুপরি, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পূর্বেকার বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন, যেখানে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। বিরোধীদের স্পষ্ট অভিযোগ, জেলহাজত এড়াতে এবং নিজের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতেই নেতানিয়াহু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *