মাত্র ১ হাজার টাকা ভাড়ার বকেয়া নিয়ে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা: রাজধানীতে ২ জন আটক

রাজধানীর লালবাগ থানাধীন আজিমপুর মেডিক্যাল স্টাফ কোয়ার্টারে মাত্র ১ হাজার টাকা বাসা ভাড়ার পাওনাকে কেন্দ্র করে স্বপন (৬০) নামে এক বৃদ্ধ কসমেটিকস ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও বুকে কিল-ঘুষি মেরে হত্যার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের ৪ নম্বর ভবনের ৮১ নম্বর ফ্ল্যাটের সামনে এবং সংলগ্ন উন্মুক্ত মাঠে এই অমানবিক ও বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার পর পরই লালবাগ থানা পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মূল অভিযুক্ত রিজভী এবং তার আপন চাচাতো ভাই রোহানকে আটক করেছে। বর্তমানে তারা দুজনেই পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং তাদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহতের পরিচয় ও জীবনযাত্রার বিবরণ

পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত বৃদ্ধ স্বপন মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার ঐতিহ্যবাহী তাহের ফকিরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মৃত আব্দুল মান্নান। তিনি পেশায় একজন সাধারণ কসমেটিকস ব্যবসায়ী ছিলেন এবং চকবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পণ্য সরবরাহ করতেন।

জীবিকার তাগিদে তিনি তাঁর আপন ছোট ভাই রাজা মোহাম্মদ সেলিমের সাথে আজিমপুর মেডিক্যাল স্টাফ কোয়ার্টারের ৪ নম্বর ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে মাসিক ৬ হাজার টাকা চুক্তিতে সাবলেটে (ভাড়ায়) দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছিলেন। দুই ভাই মিলে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কোনোমতে তাদের যৌথ সংসার ও মাদারীপুরের গ্রামের বাড়ির খরচ চালাতেন।

তুচ্ছ বকেয়া ও ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ

নিহতের ছোট ভাই এবং এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রাজা মোহাম্মদ সেলিম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে জানান, “আমার বড় ভাই স্বপন অত্যন্ত শান্ত, পরোপকারী ও নিভৃতচারী মানুষ ছিলেন। সারাজীবনে কারও সঙ্গে কখনও কোনো গণ্ডগোল বা বিরোধে জড়াতেন না। আমরা দুই ভাই এখানে সাবলেটে অত্যন্ত কষ্ট করে থাকতাম। কিন্তু ফ্ল্যাটের দায়িত্বে থাকা মূল ভাড়াটিয়া রিজভী মাস শেষ হওয়ার আগেই সবসময় আমাদের কাছে অগ্রিম ভাড়ার জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেন।”

তিনি আরও জানান, চলতি জুলাই মাসের মোট ভাড়ার মধ্যে তারা ইতিমধ্যে ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছিলেন এবং মাত্র ১ হাজার টাকা বকেয়া ছিল। গত রবিবার রাতে রিজভী আচমকা ওই বকেয়া ১ হাজার টাকা দাবি করলে স্বপন ও সেলিম জানান যে, ব্যবসার অবস্থা একটু মন্দ থাকায় দু-একদিনের মধ্যে তারা বাকি টাকাটা অবশ্যই পরিশোধ করে দেবেন। কিন্তু এই সামান্য আশ্বাসে সন্তুষ্ট না হয়ে রিজভী চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং দুই ভাইকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করাসহ দেখে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট হুমকি দিয়ে চলে যান।

পরবর্তীতে সোমবার ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে যখন পুরো কোয়ার্টারের মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন রিজভী এবং তার চাচাতো ভাই রোহান পরিকল্পিতভাবে লাঠিসোটা নিয়ে তাদের রুমের সামনে এসে দরজায় লাথি মারতে শুরু করে এবং চড়াও হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ছোট ভাই সেলিম বাধা দিতে গেলে আসামিরা তাকে বুকে ও পেটে তীব্র লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর তারা বৃদ্ধ স্বপনকে ঘর থেকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে ও জামার কলার ধরে স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের একটি নির্জন মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে রিজভী ও রোহান বৃদ্ধ স্বপনকে মাটিতে ফেলে বুকের ওপর চেপে বসে এবং এলোপাতাড়ি লাথি ও বুকে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মেরে ফুসফুস ও লিভারে গুরুতর অভ্যন্তরীণ জখম করে।

খুনিদের পলায়নের চেষ্টা ও ঢামেকে মৃত ঘোষণা

মারধরের একপর্যায়ে বৃদ্ধ স্বপন তীব্র ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে একসময় সম্পূর্ণ অচেতন ও মুমূর্ষু হয়ে মাটিতে ঢলে পড়েন। স্বপনের এই অবস্থা দেখে অভিযুক্ত রিজভী ও রোহান ভড়কে যায় এবং ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে স্বজনদের ডেকে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে নিজেরা ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ার ও পলায়নের চেষ্টা করে। পরে ছোট ভাই সেলিম ও কোয়ার্টারের অন্যান্য বাসিন্দারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্বপনকে উদ্ধার করে ভোর ৫টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ভোর ৫টা ১০ মিনিটের দিকে স্বপনকে চূড়ান্তভাবে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের ধারণা, বুকে ও পাঁজরে তীব্র আঘাতের কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক ঘটনার সত্যতা ও মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে বলেন, “আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারে মারধরের শিকার এক বৃদ্ধকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল, তবে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বর্তমানে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর সঠিক ও নিখুঁত কারণ জানা যাবে। এই ঘটনায় লালবাগ থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আটক দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো বিরোধ ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *