সারা দেশে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২ শিশুর মৃত্যু আর আক্রান্ত হয়েছে ৯৪৬ শিশু।

দেশজুড়ে মারাত্মক আকার ধারণ করা হাম ও হামের উপসর্গজনিত পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে নতুন করে হাম এবং হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে আরও ৯৪৬টি শিশু আক্রান্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে। দেশের শিশু স্বাস্থ্য খাতের ওপর চলমান এই চাপ সাধারণ পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই ২০২৬) বিকেলে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক বিশেষ কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক হালনাগাদ ও নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সার্বিক হাম পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়। অধিদপ্তর জানিয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে শিশুদের ভর্তির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

২৪ ঘণ্টার মৃত্যুর বিবরণ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে আরও দুটি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। তবে অধিদপ্তর বিশেষভাবে স্পষ্ট করেছে যে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা কিংবা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম রোগ প্রমাণিত হয়ে এই ২৪ ঘণ্টায় কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। মৃত দুই শিশুই হামের প্রাথমিক ও তীব্র উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, অনেক সময় হামের বাহ্যিক লক্ষণ যেমন তীব্র জ্বর, গায়ে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট থাকলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে সেটিকে ‘নিশ্চিত হাম’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তবে উপসর্গজনিত এই মৃত্যুগুলোকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে স্বাস্থ্য প্রশাসন।

সাড়ে তিন মাসে মোট মৃত্যু ৭৪৭ শিশু: ভয়াবহ পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ ৯ জুলাই পর্যন্ত—এই সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময়ে সারা দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে মোট ৭৪৭টি শিশু। মৃত্যুর এই বিশাল সংখ্যাটি দেশের সার্বিক টিকাদান কর্মসূচি ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সচেতনতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট মৃতের মধ্যে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত কেবল হামের সুনির্দিষ্ট উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬৫৪ জন শিশু। অন্যদিকে, ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম রোগ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসারত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছে আরও ৯৩টি শিশু। সব মিলিয়ে আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত শিশুদের এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে টিকাদান ক্যাম্পেইন আরও জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তির দৈনিক চিত্র

গত ২৪ ঘণ্টার মাঠপর্যায়ের সার্বিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, এই একদিনে ল্যাব টেস্টে নতুন করে ১২৮ জন শিশুর শরীরে হামের জীবাণু নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি হামের তীব্র ও মাঝারি উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে আরও ৮১৮ জন শিশু। ফলে ২৪ ঘণ্টায় মোট আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪৬ জনে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নতুন করে আক্রান্ত হওয়া শিশুদের মধ্যে তীব্র অসুস্থতার কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৭৬১ জন শিশুকে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে কিংবা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) পেয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে ৭৯১ জন শিশু। হাসপাতালে নতুন ভর্তি এবং ছুটি পাওয়ার এই ভারসাম্য বজায় থাকলেও শয্যা সংকটের কারণে অনেক জায়গাতেই চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়

চলমান এই হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল ও টিকাদান কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলা (MR) টিকা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। কোনো শিশুর তীব্র জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে তাকে অবিলম্বে আইসোলেশনে বা আলাদা ঘরে রাখতে হবে এবং নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। যথাযথ পুষ্টি, পর্যাপ্ত তরল খাবার এবং সময়মতো ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ালে হামজনিত জটিলতা ও মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকার ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে শিশুদের এই মহামারি সদৃশ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *