প্রশান্ত মহাসাগরে একটি কৌশলগত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ঘোষণা দিয়েছে চীন। দেশটির দাবি, একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে পৌঁছেছে এবং পুরো কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত সামরিক রীতিনীতি অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়েছে। তবে এই পরীক্ষাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাপান এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বেইজিংকে এমন পদক্ষেপ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (PLAN) প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর সমুদ্র এলাকায় একটি কৌশলগত পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ডামি বা পরীক্ষামূলক ওয়ারহেড বহনকারী একটি কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে।
চীনা নৌবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্বনির্ধারিত জলসীমার মধ্যেই সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত হেনেছে এবং পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে এই উৎক্ষেপণ পরিচালিত হয়।
চীনের দাবি, এটি তাদের নিয়মিত বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ। পরীক্ষার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল। বেইজিং আরও জানিয়েছে, এই সামরিক মহড়া কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়নি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের এই সফল পরীক্ষা সেই সক্ষমতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এটি চীনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সামরিক মাইলফলকও বটে। ১৯৮০ সালের পর দীর্ঘ বিরতির শেষে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটি প্রথমবারের মতো একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) পরীক্ষা চালায়। এবার পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাধ্যমে চীন তাদের সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অগ্রগতি তুলে ধরল।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং জাপানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আগে বেইজিং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে সম্ভাব্য উৎক্ষেপণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিল। এতে পরীক্ষার সময়, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সমুদ্রসীমার তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (এবিসি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান স্টারবোর্ড এমন কিছু স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের দুটি স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং জাহাজকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই জাহাজগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, গতি এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের নির্ভুলতা পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে জাপানের সংবাদমাধ্যম কিয়োডো নিউজ জানিয়েছে, টোকিও সরকারও আগেই চীনের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে অবহিত হয়েছিল। তবে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংকে এই ধরনের সামরিক পরীক্ষা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
জাপান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই তারা এ বিষয়ে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌথ সামরিক মহড়া এবং কৌশলগত অস্ত্র উন্নয়নকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা একটি দেশের “সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি” বা পাল্টা পারমাণবিক হামলার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে এ ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি শুধু সামরিক সক্ষমতারই নয়, কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
যদিও চীন দাবি করেছে যে পরীক্ষাটি ছিল নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ এবং কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়, তবুও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ঘটনাটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
বর্তমানে চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সামরিক কার্যক্রম আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
