বাংলাদেশে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় ভারতের গুজরাট থেকে ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন হাওড়া হোলসেল ফিস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এবং ভারতের ফিস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ। তার দাবি, গত তিন-চার মাসে গুজরাট থেকে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, ‘ভালো ইলিশের তো কোনো জোগান নেই আমাদের কাছে।’
তার ভাষ্য, বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি থাকায় গুজরাটের ইলিশের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় গুজরাটের মাছ বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। গুজরাটে ইলিশের দাম প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ রুপির মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশে পৌঁছাতে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ হয়। সেখানে মাছটি প্রায় ৬০০ রুপিতে বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে আমদানি শুল্কও দিতে হয়।
সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, ‘গত ৩-৪ মাসে, আমার মনে হয়, ৫০০ মেট্রিক টন মাছ তো গেছে।’ তবে তিনি এটিও বলেন, ‘গুজরাট থেকে বাংলাদেশে খুব বড় পরিমাণে ইলিশ যায়নি।’
এদিকে দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন ভারতের মাছ ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশে ইলিশের সরবরাহ কম থাকলেও এবার মাছ পাওয়া গেলে দাম খুব বেশি বাড়বে না বলে মনে করেন সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ। তিনি বলেন, ‘মাছ আসবে, রেট ১৫০০ রুপির মধ্যে থাকবে। মাছ নেই বলে ৫০০০ রুপি হয়ে যাবে না।’
তার মতে, বাংলাদেশে প্রথমে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করা হবে। এরপর উদ্বৃত্ত থাকলে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, প্রথমে ডোমেস্টিক মার্কেট, সেটা পূরণ হলে এক্সপোর্ট মার্কেট।
তবে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আসতে সময় লাগবে বলেও উল্লেখ করেন এই ব্যবসায়ী। তার ভাষ্য, গত বছরও বাংলাদেশে ইলিশের সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো ছিল না, এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে। এরপরও তিনি বলেন, ‘লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট।’
বাংলাদেশের ইলিশ রপ্তানিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়ার বিরোধিতা করছেন ভারতীয় মাছ আমদানিকারকেরা। সৈয়দ আনোয়ার মকসুদের দাবি, ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয়া হলে পুরো বরাদ্দের মাছ আমদানি করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘গত বছর প্রায় ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বাজারে প্রায় ১৫০ মেট্রিক টন মাছ পৌঁছেছিল।’ তার প্রস্তাব, রপ্তানির পরিমাণ কম হলেও সময়সীমা দীর্ঘ করা উচিত। এতে ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে মাছ আমদানি করার সুযোগ পাবেন এবং অনুমোদিত মাছের বড় অংশই ভারতীয় বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ জানান, ইলিশ আমদানির বিষয়ে গত মাসে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে তারা বাংলাদেশ সফর করেছেন। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গেও তারা কথা বলেছেন।
সেখানে মূলত তিনটি বিষয় তুলে ধরেছেন বলে জানান তিনি। প্রথমত, রপ্তানির সময়সীমা কম থাকায় পুরো বরাদ্দের মাছ আমদানি করা যায় না। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় দেরিতে রপ্তানির অনুমতি দেয়া হয়। তৃতীয়ত, মাছের ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, এমন অনেক প্রতিষ্ঠানকেও অনুমতি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, এবার বাংলাদেশ সরকার ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিলে যেন দীর্ঘ সময়ের জন্য সুযোগ দেয়া হয়। এতে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বেশি সময় ধরে মাছ আমদানি করতে পারবেন।
সামনে ‘রান্না পূজা’ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর আগেই বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি পাওয়া যেতে পারে। তবে অনুমতি পাওয়ার পরও ভারতের দিল্লি থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হয় বলে জানান তিনি।
গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশের বাজারে
বাংলাদেশে গুজরাটের ইলিশ যাওয়ার বিষয়টিকে ‘খুবই অসম্ভব’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ। তিনি বলেন, গুজরাটে বিপুল ইলিশ ওঠায় এবার প্রথমবারের মতো সেখানকার ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতি থাকায় এবং গুজরাটে তুলনামূলক বেশি ইলিশ পাওয়া যাওয়ায় এই বাণিজ্য হয়েছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা ইলিশের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের চাহিদার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সৈয়দ আনোয়ার মকসুদের দাবি, চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বেশি এবং ইলিশ নোনা করে সংরক্ষণেরও প্রচলন রয়েছে।
এদিকে একসময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানিই ছিল স্বাভাবিক চিত্র। এখন বাংলাদেশে সরবরাহের ঘাটতির কারণে গুজরাটের ইলিশ যেমন বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করছে, তেমনি দুর্গাপূজার আগে পদ্মার ইলিশের প্রত্যাশায় রয়েছে ভারতের বাজারও। তবে বাংলাদেশে ইলিশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই শেষ পর্যন্ত ভারতে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
