গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে পৃথক অভিযানে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে ২০২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে দেশটির কোস্ট গার্ড। লিবিয়ার উপকূল থেকে নৌকায় করে ইউরোপে যাওয়ার পথে এসব অভিবাসী বিপদে পড়েন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি, সুদানি ও মিসরের নাগরিক রয়েছেন।
গ্রিক সংবাদমাধ্যম ডিমোক্রেটিয়ার বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) সকালে ক্রিটের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আইয়েরাপেত্রা এলাকায় ৪০ জন অভিবাসী বহনকারী একটি নৌকার সন্ধান পায় ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের একটি বিমান। পরে বিষয়টি গ্রিক কোস্ট গার্ডকে জানানো হলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।
খবর পেয়ে গ্রিক কোস্ট গার্ডের সদস্যদের পাশাপাশি একটি মাছ ধরার নৌকাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পরে নৌকায় থাকা ৪০ জন অভিবাসীকে নিরাপদে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসা হয়। উদ্ধার ব্যক্তিদের আইয়েরাপেত্রা বন্দরে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাদের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই পৃথক দুটি নৌকা থেকে আরও ১১২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছিল গ্রিক কর্তৃপক্ষ। প্রথম নৌকাটিতে ৫৬ জন অভিবাসী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩১ জন সুদানের নাগরিক এবং ২৫ জন বাংলাদেশের নাগরিক।
অন্য নৌকাটিতেও ৫৬ জন অভিবাসী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৪৭ জন বাংলাদেশি এবং ৯ জন মিসরের নাগরিক। পরবর্তী সময়ে আরও ৪০ জনকে উদ্ধার করা হলে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে গ্রিক উপকূলের কাছে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২০২ জনে।
উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যাই উল্লেখযোগ্য। তিনটি নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মোট ৭২ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম নৌকা থেকে ২৫ জন এবং দ্বিতীয় নৌকা থেকে ৪৭ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। তবে সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া ৪০ জনের জাতীয়তার বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
উদ্ধার করা অভিবাসীদের হেরাক্লিয়ন বন্দরের একটি অস্থায়ী আবাসনকেন্দ্রে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের সাময়িক আশ্রয় ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও দেখভাল করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিট দ্বীপে অভিবাসীদের আগমন বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর জন্য অস্থায়ী আবাসন, খাবার, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
লিবিয়া-ক্রিট রুটে বাড়ছে অভিবাসী যাত্রা
লিবিয়ার উপকূল থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করা অভিবাসীদের জন্য ক্রিট বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হয়ে উঠেছে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা উন্নত জীবন ও নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
এই যাত্রায় অনেক সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী ছোট নৌকা ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সমুদ্রপথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, নৌযানের দুর্বল অবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রাপথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। ফলে ক্রিটের আশপাশের সমুদ্র এলাকায় গ্রিক কোস্ট গার্ডকে প্রায়ই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগরীয় ও ইউরোপমুখী অভিবাসন রুটে বাংলাদেশি নাগরিকদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বিভিন্ন কারণে অনেকে দালালচক্রের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনপথে যাত্রা করতে গিয়ে প্রতারণা, অর্থনৈতিক ক্ষতি, আটক, শারীরিক নির্যাতন এবং প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে ছোট ও অনিরাপদ নৌযানে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ক্রিটের কাছে সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতি ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসনের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত
গ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্রিটের উপকূলীয় এলাকায় অভিবাসীবাহী নৌযানের সন্ধান পেলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ফ্রন্টেক্সের নজরদারি কার্যক্রমের পাশাপাশি গ্রিক কোস্ট গার্ড সমুদ্রপথে টহল ও উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
পরপর কয়েকটি নৌকা থেকে ২০২ জনকে উদ্ধার করার ঘটনায় ক্রিট হয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের চাপের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা, লিবিয়া থেকে ক্রিটমুখী এই সমুদ্রপথে অভিবাসীদের যাতায়াত অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্ধার অভিযান আরও বাড়তে পারে।
গ্রিক কর্তৃপক্ষ বর্তমানে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করছে। একই সঙ্গে তাদের পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে। এদিকে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে অভিবাসন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও জোরালো হয়ে উঠেছে।
