শেখ হাসিনার বক্তব্যে ভারতের সমর্থন নেই: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত সরকার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল এ অবস্থান তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, গত বুধবার (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনা দিল্লিতে যে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। ভারত সরকার এসব বক্তব্যকে সমর্থনও করে না। একই সঙ্গে তিনি জানান, সংবাদ সম্মেলনটি কোনো সরকারি উদ্যোগে আয়োজন করা হয়নি; বরং একটি বেসরকারি মাধ্যম বা সংস্থার উদ্যোগে ওই আয়োজন করা হয়েছিল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের এ বক্তব্য শেখ হাসিনার দিল্লিতে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক বিতর্কে ভারতের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষোভ

এর আগে বুধবার রাতে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ক্ষুব্ধ। ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ এবং দেশের জনগণের বিরুদ্ধে ‘বিষাক্ত ঘৃণা’ ছড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শেখ হাসিনার বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সার্বভৌমত্ব ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, ঠিক সেই সময়ে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এ ধরনের মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননাকর এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।

বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত সহিংসতা ও বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব তথ্য ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো অস্বীকারের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করা শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ইতিহাস পরিবর্তনের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা প্রত্যাখ্যান করবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখপাত্র

শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টি পরিষ্কার করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ভারত সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না। ফলে সেখানে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যের দায় বা অবস্থান ভারত সরকারের ওপর বর্তায় না। ভারত সরকার শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততাও স্বীকার করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই বক্তব্য দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় তার রাজনৈতিক বক্তব্য, গণমাধ্যমে উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার বিষয়

শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে তার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ এবং পরদিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান প্রকাশ—দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেখানে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্ব, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদদের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, সেখানে ভারত বলছে, ওই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের সঙ্গে তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ফলে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কে আপাতত ভারত সরকার নিজেদের সরাসরি অবস্থান থেকে দূরে রাখার বার্তাই দিয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক বক্তব্যের পর এখন এই ইস্যুতে পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *