আর্কটিকে আধিপত্য বাড়াতে ৭০০ কোটি ডলারের আইসব্রেকার প্রকল্পে ট্রাম্প

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে খুলে যাচ্ছে নতুন কৌশলগত নৌপথ ও খনিজ সম্পদের অমূল্য সম্ভার। সেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দৌড়ে এগিয়ে যেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৃহত্তম উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর্কটিক সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অংশীদারত্বে ১১টি অত্যাধুনিক বরফভাঙা জাহাজ (পোলার আইসব্রেকার) নির্মাণের লক্ষ্যে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের এক বিশাল চুক্তি ও রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এক রাতের একটি টেলিফোন কল এবং চুক্তির নেপথ্য

দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৃহৎ আয়োজনের সূচনা হয়েছিল ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের গ্রীষ্মকালীন বাসভবনে ট্রাম্পের হঠাৎ করা একটি দীর্ঘ টেলিফোন কলের মাধ্যমে। ট্রাম্পের বহুদিনের ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল এই আইসব্রেকার প্রযুক্তির প্রতি। ১৯৯২ সালে ব্যবসায়ী হিসেবে ফিনল্যান্ড সফরের সময় দেশটির আইসব্রেকার নির্মাণ সক্ষমতা দেখে তিনি অভিভূত হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের গলফ কোর্সে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে স্টাব তাঁকে একটি আইসব্রেকারের চমৎকার ছবি উপহার দেন। উক্ত বৈঠকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে ফিনল্যান্ড থেকে দ্রুততম সময়ে এসব আইসব্রেকার আমদানির প্রাথমিক বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়।

কেন এত তড়িঘড়ি ও বাই-আমেরিকান নীতি শিথিল?

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সামুদ্রিক সামরিক জাহাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিপইয়ার্ডেই তৈরি করার নিয়ম রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুততম সময়ে জাহাজ পেতে এই প্রথা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া শিথিল করেছে:

  • ফিনল্যান্ডে প্রথম ৪টি নির্মাণ: প্রকল্পের গতি বাড়াতে প্রথম ৪টি পোলার আইসব্রেকার সরাসরি ফিনল্যান্ডের অভিজ্ঞ শিপইয়ার্ডে তৈরি হবে। বাকিগুলো তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্রের শিপইয়ার্ডে।
  • সরাসরি ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত: মার্কিন কোস্ট গার্ডের সাবেক হিসাব অনুযায়ী ৩ থেকে ৫টি ভারী আইসব্রেকারই যথেষ্ট ছিল। তবে কোস্ট গার্ডের কমান্ড্যান্ট অ্যাডমিরাল কেভিন ই. লানডে নিশ্চিত করেছেন, ১১টি সংখ্যাটি সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
  • অর্থায়নের উৎস: কংগ্রেসের অনুমোদিত ৩৫০ কোটি ডলার প্রাথমিক বাজেটের পাশাপাশি রিপাবলিকানদের বিশেষ তহবিল আইন ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর অধীনস্থ সীমান্ত নিরাপত্তা খাত থেকে এর প্রাথমিক অর্থ সংস্থান করা হচ্ছে।

রাশিয়ার রাশ টানার লড়াই ও কৌশলগত বৈষম্য

রাশিয়ার সীমান্ত ও আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা বহু বছর ধরেই অপ্রতুল ছিল। তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে বৈশ্বিক সামরিক পরিসংখ্যানের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো:

রাষ্ট্রবর্তমানে সক্রিয় পোলার আইসব্রেকার সংখ্যাপরিকল্পিত/নির্মাণাধীন যুক্ত হবে
রাশিয়া (Russia)৫৬টিবহাল ও সম্প্রসারণশীল
চীন (China)৫টিবৈশ্বিক মেরু গবেষণা ও টহল
যুক্তরাষ্ট্র (USA)২টিরও কম (জরুরি রিফ্রিজারেটেড)নতুন ১১টি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত

রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে ২০ লাখের বেশি নাগরিক বসবাস করায় ও সেখানে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় মস্কো বহুকাল ধরে আইসব্রেকারে শীর্ষে। অন্যদিকে ট্রাম্পের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রকেও সমকক্ষ শক্তিতে পরিণত হতে হবে।

সমালোচনা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি

আর্কটিক বিশেষজ্ঞ ও কোস্ট গার্ডের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, শুধুমাত্র জাহাজ নির্মাণের ৭০০ কোটি ডলার দিয়ে প্রকল্পের খরচ শেষ হবে না। এসব ভারী আইসব্রেকার সচল রাখা, গভীর মেরু অঞ্চলে নতুন বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রস্তুতকরণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজার হাজার বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগে ভবিষ্যতে মার্কিন কোষাগার থেকে আরও হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করতে হবে—যার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন পার্লামেন্টে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

তবে হোয়াইট হাউসের বাজেট দপ্তরের মুখপাত্র অ্যালি ম্যাকক্যান্ডলেস এসব সমালোচনা খারিজ করে বলেছেন, “আগের সরকারগুলো আমাদের মেরু সীমান্ত ও আর্কটিক সক্ষমতা দুর্বল হতে দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে আবারও এক নম্বর শক্তিশালী ও অদম্য আর্কটিক পরাশক্তি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *