জুলাইয়ে দেশে ৪৫৮ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪১৬, শীর্ষে ঢাকা বিভাগ

সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে সারা দেশে এক নজিরবিহীন সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র ফুটে উঠেছে। গত এক মাসে দেশজুড়ে মোট ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪১৬ জন নিহত হয়েছেন এবং এতে মারাত্মক আহত হয়েছেন আরও ৬২৯ জন। নিহতের তালিকায় ৫৭ জন নারী এবং ৪৮ জন শিশু রয়েছেন। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি—উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ।

আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট ২০২৬) গণমাধ্যমে পাঠানো রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিশেষ জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কাজনক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও পথচারী প্রাণহানি উদ্বেগজনক

সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী, জুলাই মাসে নিহতের মোট সংখ্যার মধ্যে ১০৬ জনই ছিলেন সাধারণ পথচারী, যা মোট প্রাণহানির ২৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতায় প্রাণহানির হার বেড়েছে। জুলাইজুড়ে ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মোট ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। পুরো মাসে মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল সংক্রান্ত এবং মোট প্রাণহানির ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ ঘটেছে এসব বাইক দুর্ঘটনায়।

যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানে যানবাহনের ধরণ বিশ্লেষণ করে নিহতের পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:

যানবাহনের ধরণজুলাই মাসে নিহতের সংখ্যা
থ্রি-হুইলার (ইজি বাইক, সিএনজি, অটো)৯৪ জন
বাস ও মিনিবাস২১ জন
ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রলি১৯ জন
নসিমন, ভটভটি ও স্থানীয় যান২৬ জন
মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্স৭ জন
রিকশা ও বাইসাইকেল৫ জন

মহাসড়ক ও সকালের সময় দুর্ঘটনা বেশি

প্রতিবেদনে জানা গেছে, সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি এক্সিডেন্ট বা দুর্ঘটনা ঘটেছে দেশের জাতীয় মহাসড়কে। মোট ১৬৯টি (৩৬.৮৯%) দুর্ঘটনা জাতীয় মহাসড়কে, ১৫৫টি (৩৩.৮৪%) আঞ্চলিক সড়কে, ৬৬টি (১৪.৪১%) শহরের অভ্যন্তরের সড়কে, ৬১টি (১৩.৩১%) গ্রামীণ রাস্তায় এবং ৭টি দুর্ঘটনা অন্যান্য স্থানে রেকর্ড করা হয়েছে।

সময়ের বিচারে দিনের শুরুতেই বা সকালেই সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৮.৮২% দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া রাতে ১৯.৪৩%, দুপুরে ১৭.২৪%, বিকেলে ১৪.৮৪%, সন্ধ্যায় ১২.২২% এবং ভোরে ৭.৪২% দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিভাগীয় চিত্র ও রাজধানী ঢাকা

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। ঢাকা বিভাগে ১৩৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৫ জন, যা সারা দেশের মোট দুর্ঘটনার ২৯.৩% এবং প্রাণহানির ৩০.৪%। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয়েছে বরিশাল বিভাগে (২৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত)।

অন্যান্য বিভাগের মধ্যে—

  • চট্টগ্রাম বিভাগ: ২১.৬১% দুর্ঘটনা ও ১৯.২৩% প্রাণহানি।
  • রাজশাহী বিভাগ: ১১.৩৫% দুর্ঘটনা ও ১২% প্রাণহানি।
  • রংপুর বিভাগ: ৯.৮২% দুর্ঘটনা ও ১১.২৯% প্রাণহানি।
  • খুলনা বিভাগ: ৭.৮৬% দুর্ঘটনা ও ৭.৬৯% প্রাণহানি।
  • ময়মনসিংহ বিভাগ: ৭.৪২% দুর্ঘটনা ও ৭.২১% প্রাণহানি।
  • সিলেট বিভাগ: ৬.৭৬% দুর্ঘটনা ও ৬.৭৩% প্রাণহানি।

এদিকে শুধু রাজধানী ঢাকায় জুলাই মাসে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সড়ক দুর্ঘটনার মূল ১১টি কারণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে সারা দেশে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে ১১টি মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ চিহ্নিত করেছে:

১. ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক।

২. যানবাহনের বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতি।

৩. চালকদের চরম অদক্ষতা, শারীরিক অসুস্থতা ও অসংযত মানসিকতা।

৪. পরিবহন শ্রমিকদের নির্দিষ্ট বেতন ও নির্ধারিত কর্মঘণ্টার অনুপস্থিতি।

৫. জাতীয় মহাসড়কে ধীরগতির নসিমন-করিমনের অবাধ চলাচল।

৬. তরুণদের নিয়ম ভেঙে অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল ড্রাইভ।

৭. যাত্রী ও চালকদের ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।

৮. দুর্বল ও সনাতন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।

৯. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রশাসনিক সক্ষমতার সীমা।

১০. সড়ক ও পরিবহন খাতে অব্যাহত চাঁদাবাজি।

১১. পথচারীদের মাঝে সচেতনতার অভাব।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, মহাসড়কে ধীরগতির যান বন্ধ, এবং চালকদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জোর দাবি জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *