আজ ২২ শ্রাবণ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৪১ সালের (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) এই কালো দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসংস্কৃতির এই মহান মহীরূহ। আট দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বাইশে শ্রাবণ বাঙালির হৃদয়পটে কেবলই একটি বিদায় বা শোকের দিন নয়; বরং বিশ্বকবির চিরন্তন দর্শন, সাহিত্য ও মানবতাবাদী সৃষ্টিকে নতুন করে উপলব্ধি ও উদযাপনের এক অনন্য উপলক্ষ।
সাহিত্য মহাকাশে কালজয়ী অবদান
কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র থেকে শুরু করে চিত্রশিল্প ও শিশুসাহিত্য—বাংলা সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রায় প্রতিটি অঙ্গনেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রেখে গেছেন তাঁর অনন্য ও প্রজ্ঞাভিত্তিক স্বাক্ষর। মাত্র আট বছর বয়সে কাব্যচর্চা শুরু করলেও কালক্রমে তাঁর অমর সৃষ্টিসমূহ বিশ্বসাহিত্যের মূলধারায় বাংলা ভাষাকে এক অতুলনীয় উচ্চতায় আসীন করে।
দুই হাজারেরও বেশি সুরময় গান রচনা করে তিনি প্রবর্তন করেন ‘রবীন্দ্রসংগীত’-এর মতো স্বতন্ত্র ও মহিমান্বিত ধারা। বাঙালির প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, আনন্দ ও বেদনার প্রতিটি সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশের প্রধান আশ্রয় আজও রবীন্দ্রসংগীত।
১৯১৩ সালে তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’ (Song Offerings)-র জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি সমগ্র এশিয়া মহাদেশের মধ্যে প্রথম নোবেল বিজয়ী হিসেবে ইতিহাস গড়েন এবং বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন।
জাতীয় চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সত্তা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির জাতীয় চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সুর ও বাণী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনে যোগাত অফুরন্ত সাহসিকতা, প্রেরণা ও স্বদেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। সময়ের পরিক্রমায় বাঙালির আত্মপরিচয় ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষায় বিশ্বকবির প্রাসঙ্গিকতা ক্রমেই আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী হয়েছে।
সমাজ সংস্কার, শিক্ষাভাবনা ও প্রতিবাদী দেশপ্রেম
কেবল সাহিত্য সাধনাতেই আবদ্ধ ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ; শিক্ষা বিস্তার, পল্লি উন্নয়ন ও গণমানুষের কল্যাণে তিনি ছিলেন এক বাস্তবমুখী পথপ্রদর্শক।
শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী: ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে বিশ্বপ্রকৃতি ও বিশ্বজ্ঞানের মিলনকেন্দ্র হিসেবে ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়ে তোলেন।
শ্রীনিকেতন ও কৃষিঋণ: ১৯২১ সালে সমন্বিত গ্রামোন্নয়নের লক্ষ্যে ‘শ্রীনিকেতন’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রজাহিতৈষী জমিদার হিসেবে কৃষকের দারিদ্র্য দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চালু করেছিলেন সমবায় ও কৃষিঋণ ব্যবস্থা।
নাইটহুড ত্যাগ: ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া সম্মানজনক ‘নাইটহুড’ খেতাব বর্জন করেন, যা তাঁর আপসহীন দেশপ্রেমের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
বিশ্বকবির ৮৫তম প্রয়াণ দিবসে dainikreporterbd পরিবারের পক্ষ থেকে এই অমর সৃষ্টিশীল আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।
