ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেল কোম্পানির রেকর্ড মুনাফা, যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুললেও, এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলো। তেলের উচ্চমূল্য ও বিশ্ববাজারে সরবরাহের টানাটানির সুযোগে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সর্ববৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরন যৌথভাবে ২৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন (২ হাজার ৬৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল মুনাফা অর্জন করেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ড পরিমাণ এই অংকের আয় সামনে আসতেই যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে উঠেছে। মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিষয়টি নিয়ে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকরা সরব হয়েছেন।

শেভরন, এক্সনমোবিল ও শেলের রেকর্ড আয়

সম্প্রতি প্রকাশিত কোম্পানিগুলোর দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী:

  • শেভরন: এপ্রিল-জুন সময়ে কোম্পানিটি নিট মুনাফা করেছে ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৬০ কোটি ডলার বেশি। শেভরনের সিইও মাইক ওয়ার্থ জানান, শোধনাগারের উচ্চ সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড উত্তোলনের কারণেই এ সাফল্য এসেছে।
  • এক্সনমোবিল: এই প্রান্তিকে তাদের মুনাফা হয়েছে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন (১ হাজার ৪৫০ কোটি) ডলার, যা বিগত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস জানান, বৈশ্বিক সংঘাতের মাঝেও কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাই তাদের মূল চালিকাশক্তি ছিল।
  • শেল: ব্রিটিশভিত্তিক জ্বালানি খাতের এই পরাশক্তি জানিয়েছে, আগের বছরের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের মুনাফা প্রায় দ্বিগুণে রূপ নিয়েছে।

অতিরিক্ত মুনাফা সত্ত্বেও নতুন বিনিয়োগে অনীহা

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘উড ম্যাকেঞ্জি’-র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। বিপুল পরিমাণ উইন্ডফল প্রফিট বা অতিরিক্ত মুনাফা পেলেও তেল কোম্পানিগুলো নতুন তেলক্ষেত্র অন্বেষণ বা দীর্ঘমেয়াদী খনন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে। তখন নতুন ভারী বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

উড ম্যাকেঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর অপরিশোধিত তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারের কাছাকাছি থাকলে বিশ্বজুড়ে তেল খাতের অতিরিক্ত মুনাফার পরিমাণ ৪২৫ বিলিয়ন (৪২ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারে গিয়ে ঠেকবে। উল্লেখ্য, ইরানে হামলা ও পরবর্তী সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে উঠেছিল, যা বর্তমানে ৯০ ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে।

আমাজন ও মার্কিন রাজনীতিতে তুঙ্গে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ ডলার ছড়িয়ে যাওয়ায় আমজনতার অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও শেলডন হোয়াইটহাউস সরাসরি কোম্পানিগুলোর কাছে জানতে চেয়েছেন— তারা যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে কতটুকু লাভবান হয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারণে কোনো অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে কি না।

একই সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ব্র্যাড শারম্যান যুদ্ধকালীন এই অতিরিক্ত মুনাফার ওপর বিশেষ ‘উইন্ডফল প্রফিট ট্যাক্স’ বা অতিরিক্ত মুনাফা কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

তেলশিল্পের সাফাই ও অর্থনীতিবিদদের মতামত

তবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস খাতের প্রভাবশালী সংগঠন ‘আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট’ (এপিআই) সমস্ত রাজনৈতিক অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডাস্টিন মেয়ার বলেন, “আন্তর্জাতিক তেলবাজার অত্যন্ত স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক, এখানে মূল্য কারসাজির কোনো সুযোগ নেই।” অন্যদিকে এক্সনমোবিল দাবি করেছে, তারা আগামী চার বছরে উৎপাদনে ৭১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৯৮০ সালেও যুক্তরাষ্ট্রে এমন বিশেষ কর আরোপ করা হয়েছিল, যা কোনো ইতিবাচক ফল আনেনি; বরং তা কর ব্যবস্থাকে জটিল করে দেশীয় উত্তোলন কমিয়ে দিয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চড়া দাম অব্যাহত থাকলে আগামী প্রান্তিস্বেও কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করবে, যার প্রভাব মার্কিন নির্বাচনে সরাসরি পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *