প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “একটি দেশে শক্তিশালী ও কার্যকরী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না পেলে স্থায়ী সম্প্রীতি কখনো নিশ্চিত হতে পারে না। বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও রাজনীতিমুক্ত হলে তার সুফল হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও মুসলিমসহ দেশের প্রতিটি সম্প্রদায় সমানভাবে ভোগ করবে।”
গতকাল শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘সম্প্রীতির জুলাই: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অবদান’ শীর্ষক এক তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘জুলাই আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ৯ জন সংখ্যালঘু শহীদ’
গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত আদর্শ স্মরণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা যে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা এখনো সচেতনে ধারণ করি। আন্দোলনের একেবারে প্রথম দিন থেকেই এর রূপ ছিল সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। ওই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৯ জন বীর সন্তান তাঁদের জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হয়েছেন। সকল ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে রক্ত দিয়েই এই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।”
‘সংখ্যালঘুদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পকেটে বন্দি হওয়া অনুচিত’
বিগত সরকারের সুযোগসন্ধানী রাজনীতির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “অতীতের শাসকগোষ্ঠী বা ফ্যাসিস্ট সরকার সবসময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে একটি রাজনৈতিক ‘কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার মুখাভিনয় করে বোঝানোর চেষ্টা করতো যে তারাই কেবল অসাম্প্রদায়িক, আর বাকিরা সাম্প্রদায়িক। এবারের নির্বাচনেও কাছাকাছি একটি পুরোনো প্যাটার্ন দেখা গেছে।”
সংখ্যালঘু সমাজের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে নাহিদ বলেন, “সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উচিত দেশের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা। কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের ‘পকেটে’ বন্দি হয়ে যাওয়া একেবারেই অনুচিত। কারণ, কোনো একক দলের পকেটে গেলে ওই দলের করা সমস্ত অপরাধ, অপকর্ম ও দুর্নীতির দায়ভার দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংখ্যালঘু সমাজকেই কাঁধে নিতে হয়। আবার দলগুলোরও উচিত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে তাঁরা নিজেদের কখনো অনাত্মীয় বা অনিরাপদ মনে না করেন।”
‘মন্দির পাহারা দেওয়ার পরিবেশ আমরা চাই না, বিচার নিশ্চিত করতে হবে’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক পরিস্থিতি ও সম্প্রীতি নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “অভ্যুত্থানের পর মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাত জেগে মন্দির পাহারা দিয়েছে, যা ছিল সম্প্রীতির এক অপূর্ব নিদর্শন। কিন্তু আমরা এমন পরিস্থিতি আর দেখতে চাই না যেখানে কাউকে মন্দির পাহারা দিতে হবে। সরকারের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মৌলিক দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন। শুধু গুম-খুনের বিচার করলেই হবে না; বিগত আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল, উৎখাত ও নির্যাতনসহ সব হামলার নিরপেক্ষ বিচার করতে হবে।”
ঐক্যবদ্ধ থাকার ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান
দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নতুন করে গড়ে ওঠা ভয়ের পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপি প্রধান। তিনি বলেন, “দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত ছিল। জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি ছিল প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। যদি সরকার এগুলো নিয়ে দৃশ্যমান কাজ করতো, তবে আমরা সার্বিক সহযোগিতা করতাম। এখনো গণঅভ্যুত্থানের আসল সাফল্য অর্জনে এবং অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সর্বস্তরের নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন।”
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব প্রীতম দাশের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথের, সেন্ট মেরি ক্যাথেড্রালের পরিচালক ফাদার এলবার্ট টমাস রোজারিও, এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার, আলী আহসান জুনায়েদসহ সনাতন, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ধর্মীয় ও সামাজিক নেতারা।
