স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও পরিকল্পনার অভাবে কোটি টাকার যন্ত্র অব্যবহৃত: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

বিগত দেড় দশকে দেশের স্বাস্থ্য খাতে শত শত কোটি টাকার বিপুল বরাদ্দ ও উন্নয়ন ব্যয় হলেও কেবল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তদারকির চরম সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেছেন, “কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে আধুনিক চিকিৎসাসরঞ্জাম কেনা হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সেগুলোর একটি বড় অংশ এখনো বিভিন্ন হাসপাতালে বাক্সবন্দী ও অব্যবহৃত অবস্থায় ধুলো জমছে।”

গতকাল শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) শাহ আলম বীর উত্তম মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এসব চাঞ্চল্যকর ও কঠোর মন্তব্য করেন।

‘১০ বছর ধরে বাক্সবন্দী দামি যন্ত্র, প্রশিক্ষিত জনবলের তীব্র অভাব’

স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা তুলে ধরে ড. এম এ মুহিত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে সরজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়— ৮ থেকে ১০ বছর আগে কেনা কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রের মোড়ক পর্যন্ত খোলা হয়নি। আবার কোনো কোনো হাসপাতালে নামিদামি যন্ত্রপাতি ঠিকই রয়েছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বা অভিজ্ঞ অপারেটর নেই। কোথাও কোথাও আবার মূল যন্ত্র সচল থাকলেও কেবল অতি সামান্য রিএজেন্ট বা এক্স-রে প্লেটের অভাবে প্রতিদিন শত শত রোগীকে পরীক্ষা না করিয়েই ফেরত দেওয়া হচ্ছে বা প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠাতে বাধ্য করা হচ্ছে।”

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কেবল বড় বড় ইটের দালানকোঠা নির্মাণ বা নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলেই দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কঠোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা। চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সমন্বিত বিশ্বমানের টিম ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

চমেকে ২০০ শিক্ষকের পদ শূন্য, ২২০০ বেডের বিপরীতে রোগী ৫ হাজার

চট্টগ্রামের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের চরম জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, চমেক হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ২০০টি প্রফেসিওনাল ক্যাডার পদ (অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক) খালি পড়ে রয়েছে।

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এমন তীব্র শিক্ষক ও চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও মাত্র ২ হাজার ২০০ শয্যার সক্ষমতার চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। এছাড়া দেশের প্রায় সবকটি সরকারি মেডিকেল কলেজে বেসিক সায়েন্সের (এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি) শিক্ষকের তীব্র ও সংকটাপন্ন অভাব রয়েছে।”

রোগীর সংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল উল্লেখ করে ড. মুহিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানো এবং বিদ্যমান মেডিকেল সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুদৃঢ় আশ্বাস দেন।

চমেক হাসপাতাল পরিদর্শন ও সফরসঙ্গীগণ

এর আগে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের সাথে কথা বলে সেবার খোঁজখবর নেন।

পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রীর সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক জসীম উদ্দিনসহ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকবৃন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *