জনগণের বৈষম্যহীন আকাঙ্ক্ষা ও ম্যান্ডেট অনুযায়ী ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর রূপরেখা মেনে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ও জনগণের মুখাপেক্ষী করে গড়ে তুলতে সরকারের ভেতর ও সংসদীয় প্ল্যাটফর্মে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
গতকাল শুক্রবার (৩১ জুলাই ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণসংহতি আন্দোলন (জিএসএ) আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘জুলাই গণসমাবেশ’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে জোনায়েদ সাকি এসব কথা বলেন।
সংসদীয় কমিটির বৈঠক ও ৩১ দফার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ৪ আগস্ট রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সার্বিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ৩১ দফাসহ ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ধরে সরকার সামনের দিকে এগোবে।
জোনায়েদ সাকি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো দেশেই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়। আমাদের এই ৩১ দফার লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাথে গভীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈপ্লবিক সংস্কারও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এই সমন্বিত সংস্কারের পথ ধরেই নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দিশা উন্মোচিত হবে।”
নতুন ফ্যাসিবাদের উসকানি ও ‘মব’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা
ধর্ম ও নতুন রাজনৈতিক বয়ানের নামে দেশে উদ্ভূত নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদের বিষয়ে সবাইকে চরম সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পুরোনো জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনো ধর্ম ও নিজস্ব সংকীর্ণ বয়ানের মাধ্যমে একশ্রেণির কুচক্রী মহল মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে তৎপর রয়েছে। তারা পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) সৃষ্টি করে দেশের শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়।”
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আইন হাতে তুলে নিয়ে বা কোনো ‘মব’ তৈরি করে কোনো নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। ধর্মের নাম দিয়ে, লৈঙ্গিক পরিচয় বা অন্য কোনো পরিচয়ের অজুহাতে কারও মৌলিক অধিকার হরণ করার সুযোগ বাংলাদেশে আর দেওয়া হবে না।”
নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক উদ্ধার ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে নতুন রূপরেখা
প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকার আধুনিক ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান নম্বর’ নীতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে, যা নাগরিক সেবাকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুগম করবে।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছাতে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার আর্থিক খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিনিয়োগবান্ধব সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, জিডিপির মোট ৫ শতাংশ এই দুই খাতে বরাদ্দ দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার প্রথম ধাপে চলতি বছরেই শিক্ষায় ২ শতাংশ ও স্বাস্থ্যে ১ শতাংশ বাজেট রাখা হয়েছে এবং পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে তা লক্ষ্যমাত্রায় উন্নীত করা হবে।
শহীদ পরিবার ও গণসংহতি আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গণসংহতি আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান আবদুর রশিদ বিচার, প্রশাসনিক সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশিত সংস্কারগুলো পুরোপুরি ত্বরান্বিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। পুলিশ বাহিনী সংস্কার কমিশন গঠনসহ নারী ও শিক্ষা বিষয়ক নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নে বাধা অপসারণের দাবি জানান তিনি।
উক্ত ‘জুলাই গণসমাবেশে’ গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ইউনিটের অসংখ্য নেতা-কর্মী এবং ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
