সরকারি চাকরির বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষায় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভুয়া বা প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করে বড় ধরনের জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই চক্রটির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাসহ তিন সরকারি চাকরিজীবীকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। এ নিয়ে বহুল আলোচিত এই জালিয়াতি মামলায় সিআইডির হাতে মোট ছয়জন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেন।
গতকাল শুক্রবার (৩১ জুলাই ২০২৬) ঢাকা সিআইডি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক অফিসিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে পৃথক অভিযান চালিয়ে সিআইডির নোয়াখালী ইউনিট তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও বিসিএস জালিয়াতির তথ্য
সিআইডি কর্তৃক গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন: ১. জুলফিকার আলী ওরফে রায়হান: কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক (তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে সমবায় ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন)। ২. নূরুন্নবী: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর অঞ্চল-২ কার্যালয়ের অফিস সহায়ক। ৩. মো. সোহেল: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর অঞ্চল-২ কার্যালয়ের কর্মচারী।
যেভাবে ধরা পড়ল প্রক্সি জালিয়াতি
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন ‘কর অঞ্চল-নোয়াখালী’র গ্রেড-১৩ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরির শূন্য পদে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল। এর অংশ হিসেবে গত ৫ জুন নোয়াখালী জেলার তিনটি পরীক্ষাকেন্দ্রে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে সর্বমোট ১১২ জন প্রার্থীকে সাময়িকভাবে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য মনোনীত করা হয়। পরবর্তীতে চূড়ান্ত নিয়োগ ও যোগদানের জন্য গত ২১ জুন প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্রসহ মনোনীতদের নোয়াখালী কার্যালয়ে যোগদানের নির্দেশ প্রদান করে কর্তৃপক্ষ।
যোগদানের দিনে প্রয়োজনীয় সনদ ও কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় ‘অফিস সহায়কের’ পদে মনোনীত মো. কামাল উদ্দিন এবং ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ পদে মনোনীত মো. নাসফুরুল্লাহর মূল আবেদনপত্রের হাতের লেখার সঙ্গে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার চেকলিস্টে থাকা লেখার মধ্যে স্পষ্ট অমিল ও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। সন্দেহ তৈরি হলে তাঁদের উপস্থিতিতেই পুনরায় একটি সাদা কাগজে একই কথা লিখতে দেওয়া হয়, কিন্তু তাঁদের হাতের লেখা পূর্বের চেকলিস্টের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলেনি।
নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কামাল উদ্দিন ও নাসফুরুল্লাহ স্বীকার করেন যে, মোটা অঙ্কের চুক্তিতে পরীক্ষায় নিজেরা অংশ না নিয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী বসিয়ে পাস করেছেন।
পরদিন ২২ জুন একইভাবে কাগজপত্র পুনঃযাচাইকালে মো. সুজন নামের অপর এক প্রার্থীর হাতের লেখাতেও মারাত্মক অমিল পাওয়া যায়। ওই সময় তাঁর সাথে থাকা রাশেদ উদ্দিন নামের অপর এক অভিযুক্ত প্রার্থী জালিয়াতির বিষয়টি বুঝতে পেরে কৌশলে সটকে পড়েন। পরবর্তীতে সুজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনিও প্রক্সি পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে পাস করার কথা স্বীকার করেন।
সুধারাম থানায় মামলা ও সিআইডির তদন্ত
জালিয়াতির এই ঘটনা প্রকাশের পরপরই নোয়াখালীর সুধারাম থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি সিআইডির তফসিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় সিআইডি নোয়াখালী জেলা ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট তৈরি করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী জোগাড় করে দিচ্ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের মাতারবাড়ী থেকে সিআইডির চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার পথে বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত জুলফিকার আলীকে এবং চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর কার্যালয় থেকে নূরে নবী ও সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিএমপি ও সিআইডি সূত্রে জানানো হয়েছে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফেরাতে এই সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মামলার বাকি জড়িতদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে।
