ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং দেশটির অন্যতম প্রধান বিমান সংস্থা ‘মাহান এয়ার’কে বেআইনিভাবে সামরিক পণ্য সরবরাহ, লজিস্টিকস ও অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে চীন, ভারত, রাশিয়া ও ইরানের ছয়জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ।
শুক্রবার (৩১ জুলাই ২০২৬) মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয়। ওয়াশিংটনের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত আইআরজিসির হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অস্ত্র, বিস্ফোরক ও সামরিক কর্মী পরিবহনে অভিযুক্ত মাহান এয়ারের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও অর্থনৈতিক চ্যানেল সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিতেই এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ’ ও মার্কিন বার্তা
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক জে হিলোটিন নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় চীনের সাংহাই শহরভিত্তিক একাধিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান, রাশিয়ার একটি আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গো সংস্থা এবং মাহান এয়ারের হয়ে কাজ করা বেশ কয়েকজন জেনারেল সেলস এজেন্টকে (জিএসএ) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক কঠোর বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেন, “আইআরজিসি কিংবা মাহান এয়ারের মতো সংস্থাকে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে আর্থিক বা লজিস্টিক সহায়তা প্রদানকারী বিশ্বের যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কার্যত একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের সব পক্ষকে মার্কিন মূলধারার আর্থিক ব্যবস্থা (US Financial System) থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করার সর্বাত্মক কার্যক্রম ওয়াশিংটন অব্যাহত রাখবে।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ‘সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ’ (Maximum Economic Pressure) নীতির অংশ হিসেবেই সর্বশেষ এই সর্বাত্মক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো। একই সাথে ইরানের তেল ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর অব্যাহত চাপের পাশাপাশি দেশটির প্রধান প্রধান কৌশলগত বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ এবং সম্ভাব্য বিমান হামলার মধ্য দিয়ে সামরিক চাপও সমানভাবে বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
নিষেধাজ্ঞার আইনি প্রভাব ও সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওএফএসি-র এই পদক্ষেপের ফলে নতুন করে তালিকাভুক্ত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের যাবতীয় প্রবেশাধিকার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। একই সাথে কোনো মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার বাণিজ্যিক লেনদেন করতে পারবে না।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, তৃতীয় কোনো দেশের (যেমন: ভারত, চীন বা রাশিয়া) ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি এসব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য অব্যাহত রাখে, তবে তারাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা দ্বিতীয় স্তরের বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
আইআরজিসির বিস্তৃত অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ও মাহান এয়ার
উল্লেখ্য, বেসামরিক বিমান সংস্থা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিলেও মাহান এয়ার দীর্ঘ দিন ধরেই আইআরজিসির বিশেষ এলিট ফোর্স ‘কুদস ফোর্স’-এর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম সিরিয়াসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে গোপনে পরিবহনের অভিযোগে মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তবে মাহান এয়ার কর্তৃপক্ষ এসব মার্কিন অভিযোগকে শুরু থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
আইআরজিসি কেবল ইরানের একটি সামরিক পরাশক্তিই নয়, তাদের রয়েছে সুবিশাল এক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ নামক তাদের প্রধান প্রকৌশল কনগোলমারেট এবং ‘বুনিয়াদে তাউন সেপাহ’ (আইআরজিসি সমবায় ফাউন্ডেশন)-এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের আবাসন, তেল, গ্যাস, রিয়েল এস্টেট অবকাঠামো এবং ব্যাংকিং খাতে তারা বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে আইআরজিসি বিশ্বজুড়ে ছায়া তেল বাণিজ্য (Shadow Oil Trade), ভুয়া ফ্রন্ট কোম্পানি, চোরাচালান ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে আসছে।
সর্বশেষ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ইরান সরকার কিংবা তালিকাভুক্ত চীনা, রুশ বা ভারতীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
