ঐতিহাসিক জুলাই গণ-আন্দোলনের মহান অর্জন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর একার নয়, বরং এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্মিলিত ও অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের ফল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই আন্দোলনে শাহাদাতবরণকারী বীর শহীদরা কোনো একক দলের সম্পত্তি নন, তারা সমগ্র জাতির সম্পদ। তাই জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সর্বোচ্চ সম্মান ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব।
আজ শুক্রবার (৩১ জুলাই ২০২৬) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত ত্রি-বার্ষিক বিশেষ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
১ আগস্ট জামায়াতকে নিষিদ্ধ ও স্বৈরাচারের পতন
বিগত সরকারের বেআইনি সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “২০২৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার সম্পূর্ণ অন্যায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে তাদের সেই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই মহান আল্লাহর ইচ্ছা এবং অকুতোভয় জনগণের তুমুল আন্দোলনের মুখে সেই সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি রক্ত ও ত্যাগ স্বীকার করেছে আমাদের দেশের মেহনতি শ্রমিক সমাজ। জাতিসংঘের অফিসিয়াল তথ্যের বরাত দিয়ে জামায়াত আমির উল্লেখ করেন, আন্দোলনের প্রায় ১ হাজার ৪০০ শহীদের মধ্যে পেশাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। শ্রমিকদের পাশাপাশি ছাত্র ও সাধারণ জনগণ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
‘দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বৃদ্ধি ও সরকারের নৈতিক পরাজয়’
বর্তমান বিএনপি সরকারের নীতি ও শাসন ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পর দেশে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কমার কথা থাকলেও তা না কমে বরং বহুগুণে বেড়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা দেশের প্রতিটি সড়কে এখনো চাঁদাবাজ চক্রের চরম নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই তাদের মারধর এবং চালকদের গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে।”
তিনি সরকারের প্রতি প্রশ্ন তুলে বলেন, “সম্প্রতি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের ব্যর্থতার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। যখন সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি নিজেই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিলেন, তখন এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার আর কোনো নৈতিক অধিকার থাকে কি? নৈতিক দিক থেকে এই সরকার দেশ পরিচালনার আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার হারিয়েছে।”
পরিবহন শ্রমিকদের ১২ দফা ও গণভোটের রায়
অনুষ্ঠানে পরিবহন শ্রমিকদের উত্থাপিত ১২ দফা যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সংহতি ও সমর্থন জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেই আজ তাদের রাজপথে দাবি তুলতে হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষ ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী সর্বদা পাশে থাকবে।
তিনি গণভোটের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সরকারকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, “গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো জনগণের মতামত। গণভোটে দেশের মানুষ যে স্পষ্ট রায় দিয়েছে, আপনারা যদি নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করেন, তবে সেই রায় বিনাবাক্যে মেনে নিতে হবে। জনগণের ঐতিহাসিক রায়কে অস্বীকার করা মানে সরাসরি ১৮ কোটি মানুষকে অপমান করা। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে জামায়াত রাজপথে তার তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।”
বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কবির আহমদের সভাপতিত্বে সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানসহ শ্রমিক সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
