সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় ভোগদখলের অধিকার রাখার বিধান আসছে: আইনমন্ত্রী

সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হেবা করার পরও বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ ভোগ-দখল ও নিয়ন্ত্রণের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ (Transfer of Property Act) সংশোধনের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের এই ঐতিহাসিক আইনি পরিবর্তনের ফলে আদালতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা দেওয়ানি বা সিভিল মামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।

বিদ্যমান হেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রবীণদের অসহায়ত্ব

বর্তমানে দেশে প্রচলিত হেবা ও দান ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, “আমাদের মুসলিম আইনে ‘হেবা’, হিন্দু আইনে ‘উইল’ কিংবা মুসলিম আইনে ‘ওয়াসিয়তনামা’র মতো সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান হেবা ব্যবস্থায় বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়া মাত্রই সাথে সাথে তাদের হাত থেকে ওই সম্পত্তির ওপর সর্বময় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। এর ফলে জীবন সায়াহ্নে এসে বাবা-মা তাঁদের নিজেদের অর্জিত সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন এবং অবধারিতভাবে সন্তানের দয়া বা ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।”

তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, “সম্পত্তি পাওয়ার পর ছেলে-মেয়ে যদি পরবর্তীতে বৃদ্ধ বাবা-মার দেখাশোনা না করে কিংবা তাঁদের ভরণপোষণ না দেয়, তবে আইনি জটিলতার কারণে অসহায় বাবা-মার তখন আর কিছুই করার থাকে না। তাঁরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিনপাত করেন।”

‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ বা জীবনস্বত্বের নতুন বিধান

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উল্লেখ করেন, হেবার পাশাপাশি ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’-এ সাধারণ গিফটের একটি ধারা রয়েছে। এই আইনি সীমাবদ্ধতা দূর করতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ১৯৬৩ সালের তৎকালীন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ (Usufruct Right) বা জীবনস্বত্বের স্পষ্ট বিধান যুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছে বর্তমান সরকার।

প্রস্তাবিত এই নিয়ম অনুযায়ী, সন্তানকে জমি বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রি বা গিফট করে দেওয়ার পরও বাবা-মা তাঁদের জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি পুরোপুরি ভোগদখল, পরিচালনা এবং সেখান থেকে আয় করার অধিকার নিজেদের আইনি হেফাজতে রেখে দিতে পারবেন।

এককভাবে বিক্রির সুযোগ নেই, থাকছে জেলা জজের বিশেষ ক্ষমতা

আইন প্রস্তাবনার কঠোর শর্ত তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, নতুন সংশোধন অনুযায়ী বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় উভয় পক্ষের (বাবা-মা ও সন্তান) যৌথ সম্মতি ছাড়া কোনো পক্ষই ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না। অর্থাৎ সন্তান যেমন এককভাবে সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবে না, তেমনই বাবা বা মা-ও চাইলেও একক সিদ্ধান্তে তা বিক্রি করতে পারবেন না।

তবে বিশেষ কিছু চরম জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আইনে ছাড়ের বিধান রাখা হচ্ছে। আইনমন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যদি এমন কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, বাবার জীবন বাঁচাতে জরুরি চিকিৎসার দরকার এবং এই সম্পত্তি বিক্রি করা ছাড়া অর্থসংস্থান কোনোভাবেই সম্ভব নয়, অথচ নিষ্ঠুর সন্তান বিক্রিতে সম্মতি দিচ্ছে না—সেক্ষেত্রে স্থানীয় জেলা জজকে একটি বিশেষ প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া থাকছে। জেলা জজের কাছে আবেদন করা হলে তিনি সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দিতে পারবেন।”

আইনমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই আইনি সংশোধনের ফলে ভবিষ্যতে দেশের দেওয়ানি আদালতে সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত মামলার পাহাড় কমবে এবং হাজার হাজার পারিবারিক জটিলতার স্থায়ী অবসান ঘটবে। তিনি বলেন, “আমরা জনগণের স্বার্থে ইতিবাচক কাজ ও পরিবর্তন করতে চাই। জনগণের কল্যাণে যেখানে যেভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব, বর্তমান সরকার সেখানে ঠিক সেভাবেই পদক্ষেপ নেবে।”

বাগেরহাটে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে বাগেরহাটে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা গুমের (Enforced Disappearance) একটি মারাত্মক অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান স্পষ্ট বার্তা দেন। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা এই গুমের ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করবে সরকার। আইন সবার জন্য সমান এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *