জামায়াতের কথিত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও আমাদের সজাগ থাকতে হবে: নুরুল হক নুর

জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কৌশলী উত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি এবং বর্তমান সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক এজেন্ডা এবং কথিত নানা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে এখনই সর্বোচ্চ সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল রবিবার (১৯ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণঅধিকার পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই : প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

জামায়াতের দ্বিমুখী নীতি ও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের সুযোগ

প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান দ্বিমুখী রাজনৈতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আজ তারা প্রকাশ্য জনসভায় বাইরে সরকারবিরোধী চরম ও উগ্র বক্তব্য দিচ্ছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে ভেতরে সরকারের সাথে এক ধরনের ইতিবাচক আলোচনা বা সমঝোতা বজায় রাখছে। বাইরে উসকানিমূলক ও আপত্তিকর বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে অযথা উত্তেজিত করা হচ্ছে, যার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফল হিসেবে দেশে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের একটি নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হলেও এই অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদে একদল শিক্ষার্থীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুকৌশলে জামায়াতপন্থীদের পদায়ন করা হয়েছে। দেশের পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় জ্বালানি খাত ও প্রশাসনসহ বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের বিভিন্ন স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট চরমপন্থী রাজনৈতিক বলয়ের একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পিত চেষ্টা ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে।

প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার অভিযোগ

ভার্চুয়াল জগতে জামায়াতের একচেটিয়া দাপটের তথ্য সামনে এনে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুর বলেন, “বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইটি সেল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে এমন একটি অলীক ধারণা বা বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যেন জামায়াতই এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় ও একক রাজনৈতিক শক্তি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের স্বাধীন জনমতকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে। অথচ মাঠপর্যায়ের অনেক আসনে বাস্তবতার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই কৃত্রিম প্রচারের কোনো ধরনের মিল বা ভিত্তি ছিল না।”

তিনি আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের একাংশের রাজনৈতিক বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু তরুণ নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও ভিত্তি গড়ে তোলার আগেই সম্পূর্ণভাবে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, যা দেশে একটি সুস্থ ও নতুন ধারার বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জামায়াতকে যারা আদর্শিকভাবে সমর্থন করে, তারা তো জামায়াতেই আছে; কিন্তু নতুন করে যদি আরেকটি প্রক্সি (Proxy) বা ছদ্মবেশী রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয়, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও শহীদানদের রক্ত চিরতরে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিদেশি শক্তির স্বার্থ ও উগ্রবাদের বয়ান তৈরির আশঙ্কা

বক্তব্যে বিদেশি শক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে নুরুল হক নুর বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সময় এবং আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের অপচেষ্টা চালিয়েছে।” তিনি গুরুতর অভিযোগ এনে বলেন, জামায়াতকে সামনে রেখে দেশে নতুন করে ‘উগ্রবাদের উত্থান’-এর একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরেকটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির গভীর চক্রান্ত হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জামায়াতের এই অনিয়ন্ত্রিত উত্থান ও অনুপ্রবেশ ঘটলে আগামী দিনে বাংলাদেশে এক চরম অস্বাভাবিক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই এখনই দেশের বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সমাজকে সচেতন হতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জামায়াতের উগ্র রাজনীতির প্রশ্নে একটি অভিন্ন জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

গণঅধিকার পরিষদের উক্ত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জুলাই আন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *