মিয়ানমার সীমান্তে ১০৯ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়ার প্রস্তাব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার জের ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পিলওভার (প্রভাব) ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে ১০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন।

যুদ্ধকবলিত মিয়ানমার সীমান্ত ও ল্যান্ডমাইন ঝুঁকি মোকাবেলা

মিয়ানমার সীমান্তের বর্তমান অস্থিতিশীল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনীতি উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিভিন্ন কৌশলগত কারণে মিয়ানমার সীমান্ত এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে আরাকান আর্মি (AA) ও মিয়ানমারের জান্তা সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রায় সার্বক্ষণিক ভয়াবহ সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ওপারে আরএসইউ, আরসা, আরাকান আর্মিসহ আরও বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ছটা ও গোলাগুলির প্রভাব অনেক সময় বাংলাদেশের ভূখণ্ডেও এসে আছড়ে পড়ছে। এতে সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান যেমন বাড়ছে, ঠিক তেমনি ওপার থেকে আসা গোলার আঘাতে আমাদের নিরীহ নাগরিকরা মৃত্যুবরণ করছেন। এই পুরো পরিস্থিতি এড্রেস বা সমাধান করতেই আমরা সীমান্তে ১০৯ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তাবনা তৈরি করেছি।”

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, মিয়ানমার সীমান্তের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভারতের সীমান্তের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই দুই সীমান্তকে একই সমীকরণে দেখা যাবে না। সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ঝুঁকির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “সীমান্ত এলাকায় মাইন শনাক্তে ও দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যান্ডমাইন ডিটেকশন যন্ত্রপাতি আমরা ইতিমধ্যে সংগ্রহ করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করেছি। বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মাঠে সেই ডিটেক্টর নিয়ে কাজ করছেন।”

‘পুশইন’ প্রসঙ্গে কঠোর বার্তা: তালিকা না দিলে প্রবেশ নয়

ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “সরকার এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র বা সীমান্ত দিয়ে কাউকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি। আমাদের বীর বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং স্থানীয় জনগণের অভূতপূর্ব সহায়তায় আমরা সফলভাবে এখনো পর্যন্ত যেকোনো ধরনের পুশইন ঠেকাতে সক্ষম হয়েছি।”

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, “ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্মেন্ট (পশ্চিমবঙ্গ সরকার) নতুনভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর সেখানে প্রাদেশিক সরকারের কিছু নিজস্ব পলিটিক্যাল এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে হয়তো এই পুশইনের মহড়া প্রদর্শন করতে চেয়েছে। সেই বিষয়ে আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নাই; আমরা সরাসরি কথা বলব ভারতের কেন্দ্রীয় (দিল্লি) সরকারের সঙ্গে। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—যদি সত্যিই সেরকম কোনো বাংলাদেশি নাগরিক সেখানে অবস্থান করে থাকে, তবে তার তালিকা ভারতকে বিধি মোতাবেক আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ন্যাশনালিটি ভেরিফিকেশন (জাতীয়তা যাচাই) করব। যাচাইয়ে যদি সত্যতা পাওয়া যায়, তবেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের ফেরত নিয়ে আসা হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো চোরাগোপ্তা উপায়ে বা পুশইনের মাধ্যমে আমরা কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এলাউ করব না।”

বিজিবির বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বিশেষ পদক ও সনদের উদ্যোগ

সীমান্তে পুশইন প্রতিরোধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ বিজিবি সদস্যদের জন্য বিশেষ কোনো পুরস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সীমান্তে সাহসিকতাপূর্ণ কাজের জন্য বিজিবি সদস্যদের প্রতি বছর নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় পদক দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের পুশইন প্রতিরোধের বিশেষ ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে এই পদকের পাশাপাশি বিশেষ প্রশংসাপত্র বা সনদ কিংবা অন্য কোনো অতিরিক্ত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে আমি বিজিবির মহাপরিচালকের (ডিজি) সঙ্গে আজই উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করব।”

তিনি আরও যোগ করেন, জনসম্পৃক্ত বাহিনী হিসেবে পুলিশের কার্যক্রমকে আরও জনবান্ধব করতে যেমন ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও খারাপ কাজের জন্য তিরস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবির ক্ষেত্রেও কর্মদক্ষতা বাড়াতে প্রয়োজন হলে অনুরূপ অতিরিক্ত স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *