জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে বর্তমান সরকারের মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের (Solar Power) উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার এক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রথাগত অনুদান বা ভিক্ষার ওপর নির্ভর না করে লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওগুলোকে (NGO) সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) আয়োজিত ‘ভয়েস অব ডেভেলপমেন্ট: ব্রিজিং ডায়ালগস, পলিসিজ অ্যান্ড পার্টনারশিপস ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কর্মশালার উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব তথ্য জানান।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি হ্রাস ও রিজার্ভের চাপ কমানোর কৌশল
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, “আমরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছি, আমাদের বর্তমান সরকারের মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে যাব। এটি সফলভাবে করা গেলে আমদানিনির্ভর এনার্জির প্রয়োজন নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। ফলে জ্বালানি আমদানিতে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে, সেই উদ্বৃত্ত টাকাটা আমরা দেশের অন্য বড় উন্নয়ন খাতে ব্যবহার করতে পারব।”
বিদ্যুৎ বিভাগের পাওয়ার সেলের সর্বশেষ অফিসিয়াল তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বর্তমানে মাত্র ৭৯৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
মন্ত্রী দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চলমান সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র দুই মাসে পেট্রোলসহ বিভিন্ন জ্বালানি আমদানিতেই রাষ্ট্রকে ২০০ কোটি ডলার (২ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করতে হয়েছে, যা যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির রিজার্ভের ওপর বিরাট চাপ। এর ওপর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো তীব্র বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাপ দিন দিন কমছে এবং চাহিদা মেটাতে চড়া দামে এলএনজি (LNG) আমদানি করতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়ায় সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি (Subsidy) দিতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন। এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ নবায়নযোগ্য জ্বালানি।
গ্রামীণ ছাদে সোলার ও নেট মিটারিং: এনজিওর জন্য নতুন ব্যবসা
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রশংসা করে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, এনজিওগুলো এখন গ্রামীণ জনপদে গুচ্ছভিত্তিক (Cluster-based) সৌর প্যানেল স্থাপন করে ‘নেট মিটারিং’ (Net Metering) পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি সরকারের কাছে বা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে। এতে বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত উঠে আসবে এবং এটি একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল হবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশে আপনারা যদি বাড়িগুলোর চালের উপর সোলার প্যানেল স্থাপন করেন এবং মাস শেষে নেট মিটার দিয়ে বিদ্যুৎ গণনার মাধ্যমে পয়সা আদায় করে নিতে পারেন, তবে গ্রামীণ অঞ্চলের বিদ্যুৎ কভারেজ ও এনজিওর আয়—উভয়ই বহুগুণ বেড়ে যাবে।” এ ধরনের গ্রিন এনার্জি প্রকল্পে অর্থায়নের কোনো সংকট হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বিপুল তহবিল কনসেশনাল রেটে (নমনীয় সুদে) দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সহজেই পাওয়া সম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ভিক্ষা বা অনুদান না চেয়ে, ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে তা সফলভাবে ফেরত দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
মাঠপর্যায়ের উদ্ভাবন: ইজিবাইক ও বায়োগ্যাসের উদাহরণ
দেশের সাধারণ মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির প্রশংসা করে মন্ত্রী একজন সাধারণ ইজিবাইকচালকের বাস্তব উদাহরণ টানেন, যিনি একটি ছোট সৌর প্যানেল ও পুরনো দুটি ব্যাটারি ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাশাপাশি কৃষি সেচের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, যেভাবে গভীর নলকূপের মালিকরা কৃষকদের কাছে সেচের পানি বিক্রি করেন, একইভাবে সৌরচালিত সেচপাম্পও বর্তমানে একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হতে পারে। এ ছাড়া ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীর সফল স্বাবলম্বী হওয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গবাদিপশুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের বাড়িতেও রান্নার গ্যাস বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরবরাহ করা সম্ভব।
১৭ বছরের অবহেলা ও সমুদ্রসীমায় নতুন দরপত্র
বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক আমলের সমালোচনা করে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে আমরা সমুদ্রসীমা অর্জনের ঐতিহাসিক গৌরব উদ্যাপন করলেও বাস্তবিক অর্থে ব্লু-ইকোনমি বা সামুদ্রিক সম্পদকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র থেকে পুরোদমে গ্যাস উত্তোলন করছে, আর আমরা এখনো কেবল প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর্যায়ে পড়ে রয়েছি।” এই স্থবিরতা কাটাতে বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
কর্মশালায় মন্ত্রী আরও জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার ইতিমধ্যে সৌর প্যানেল ও সোলার ব্যাটারির ওপর বিশেষ কর ও শুল্কসুবিধা (Tax Incentives) প্রদান করছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এনজিও প্রতিনিধিরা টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠকের সুযোগ চাইলে বিদ্যুৎমন্ত্রী সেই বার্তাটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
