মেসিকে হারিয়ে ইতিহাস এমবাপ্পের, গোল্ডেন বুট ফ্রান্স অধিনায়কের; গোল্ডেন বল রদ্রির

যুক্তরাষ্ট্র, মেটলাইফ এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ৪৮ দলের স্বপ্নের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ আসর শেষ হলো এক নতুন ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। ফাইনালে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে স্পেনের বিশ্বজয়ের পর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে এবারের আসরের সেরা পারফর্মারদের তালিকা। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের পর এবারও ব্যক্তিগত দ্বৈরথে মুখোমুখি হয়েছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি। তবে এবার কাতার ট্র্যাজেডির প্রতিশোধ নিয়ে মেসিকে খালি হাতে ফিরিয়ে অনন্য এক বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন ফরাসি অধিনায়ক এমবাপ্পে। অন্যদিকে, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব গোল্ডেন বল জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মাঝমাঠের জেনারেল রদ্রি।

টানা দুবার গোল্ডেন বুট: এমবাপ্পের অতিমানবীয় বিশ্বরেকর্ড

বিশ্বকাপের দীর্ঘ ৯৬ বছরের ইতিহাসে টানা দুই আসরে গোল্ডেন বুট (সর্বোচ্চ গোলদাতা) জেতার কীর্তি এমবাপ্পের আগে আর কোনো ফুটবলারের ছিল না। কাতার বিশ্বকাপে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতা এমবাপ্পে এবার নিজেকেই ছাড়িয়ে গেছেন। টুর্নামেন্টে মোট ১০টি চোখধাঁধানো গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে সোনার বুট নিজের করে নিয়েছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। এই ১০ গোলের ওপর ভর করে বিশ্বকাপের সর্বকালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২২ গোল করার অবিসংবাদিত রেকর্ড এখন এই ২৭ বছর বয়সী তারকার দখলে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্স ৬-৪ গোলের এক পাগলাটে ব্যবধানে হারলেও এমবাপ্পে একাই করেছিলেন জোড়া গোল, যা মূলত তাঁর গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করে দেয়। অন্যদিকে, ফাইনালে গোল করতে ব্যর্থ হওয়া লিওনেল মেসিকে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সিলভার বুট (Silver Boot) জিতে। এর মধ্য দিয়ে ২১ গোল নিয়ে শেষ হলো মেসির মহিমান্বিত বিশ্বকাপ অধ্যায়। এ ছাড়া ৭ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট নিয়ে ব্রোঞ্জ বুট (Bronze Boot) জিতেছেন ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম। নরওয়ের আর্লিং হলান্ড সমান ৭ গোল করলেও অ্যাসিস্টের সমীকরণে পিছিয়ে থাকায় বেলিংহাম এই পুরস্কার পান।

৫৬ বছর পর ১০ গোলের মাইলফলক

বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো খেলোয়াড়ের ১০ গোল করার নজির আধুনিক ফুটবলে ছিল এক অলীক কল্পনা। সর্বশেষ ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গার্ড মুলার এক আসরে ১০ গোল করেছিলেন। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর গার্ড মুলারের সেই অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৩ গোল করার জুস্ত ফন্তেইনের (১৯৫৮ সাল) ঐতিহাসিক রেকর্ডটি এখনো অক্ষত রয়েছে।

গোল্ডেন বল রদ্রির, রক্ষণদুর্গে স্পেনের জয়জয়কার

ঝলমলে ড্রিবলিং বা অতিমানবীয় একক গোল না থাকলেও গোটা টুর্নামেন্টে স্পেনের প্রতিটি জয়ের নিখুঁত রূপকার ছিলেন ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি। বিশেষ করে সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঝমাঠ একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রেখে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করায় টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর হাতে উঠেছে পবিত্র ‘গোল্ডেন বল’ (Golden Ball)।

এবারের বিশ্বকাপে বিশ্বজয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পুরস্কারেও ছিল স্পেনের একচেটিয়া জয়জয়কার। পুরো টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য ৭টি ক্লিন শিট রেখে এবং পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটিমাত্র গোল হজম করে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন জিতে নিয়েছেন সেরা গোলকিপারের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভ’ (Golden Glove)। এই পথচলায় টানা ৬৪৯ মিনিট নিজের জাল সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের এই দেওয়াল। এ ছাড়া টুর্নামেন্টজুড়ে স্পেনের রক্ষণভাগকে দুর্ভেদ্য দুর্গ বানিয়ে রাখা বার্সেলোনার মাত্র ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি জিতে নিয়েছেন বিশ্বকাপের ‘সেরা তরুণ খেলোয়াড়’-এর (Best Young Player) পুরস্কার।

নতুন প্রথা ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ ও সর্বোচ্চ প্রাইজমানি

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপে ফিফা একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজকীয় প্রথার প্রবর্তন করেছে। চ্যাম্পিয়ন স্পেন দলের প্রতিটি সদস্যের হাতে ফিফা তুলে দিয়েছে বিশেষ ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ (Championship Ring)। এর পাশাপাশি বিজয়ী দল হিসেবে স্পেনের ফুটবল ফেডারেশন লাভ করেছে ৫ কোটি মার্কিন ডলার প্রাইজমানি, যা ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে সর্বোচ্চ আর্থিক পুরস্কারের রেকর্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *