ম্যাচ চলাকালীন সময়েই বিশ্বখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরির মাইক্রোফোন থেকে ভেসে আসছিল এক অমোঘ প্রশ্ন— “বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এর চেয়ে একপেশে ফাইনাল কি কখনো দেখেছে বিশ্ব?” মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা কিংবা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আর্জেন্টিনার অতি কট্টর সমর্থকেরাও বোধ হয় আজ পিটার ড্রুরির এই নির্মম প্রশ্নের জবাবে ‘না’ বলার সাহস পাবেন না। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালের পুরো ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস মহাকাব্যে গোলমুখে একটিও ‘অন-টার্গেট’ শট নিতে না পারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফুটবলের নতুন রাজা হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরলো স্পেন।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ম্যাচের একমাত্র ও ভাগ্যনির্ধারণী গোলটি এসেছে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে, স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা তারকা ফেরান তোরেসের পা থেকে। এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে স্পেনের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী গোলটিও এসেছিলো আরেক বার্সা কিংবদন্তি আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার জাদুকরি পা থেকেই।
প্রথম মিনিট থেকেই খোলসবন্দী আর্জেন্টিনা, অনবদ্য মার্টিনেজ
অবিশ্বাস্য ও পরিসংখ্যানগতভাবে সত্য যে, পুরো ম্যাচে স্পেনের ১১টি নিখুঁত ‘অন টার্গেট’ শটের বিপরীতে একটি শটও স্প্যানিশ গোলপোস্টে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই কোচ লিওনেল স্কালোনির দল নিজেদের অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক খোলসে বন্দী করে রেখেছিল। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে যে চিরচেনা ধার ও ক্ষিপ্রতা দেখা গেছে, আজ ফাইনালে তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেলো না। স্পেন নিজেদের পায়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল একচেটিয়াভাবে, আর আর্জেন্টিনা যতবারই বলের নাগাল পেয়েছে, ফরোয়ার্ড পাস দেওয়ার চেয়ে সাইড পাস আর ব্যাক পাসেই তাদের বেশি মনোযোগী মনে হয়েছে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ডিফেন্সের মূল ভরসা লিসান্দ্রো মার্টিনেজ চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে আলবিসেলেস্তেরা আরও বেশি গুটিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে ল্যামিন ইয়ামাল ও দানি ওলমোরা একের পর এক আক্রমণ করে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেও প্রতিবারই চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন আলবিসেলেস্তে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সহজ কিছু সুযোগ হাতছাড়া না হলে এবং মার্টিনেজ পোস্টের নিচে বীরত্ব না দেখালে জয়ের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত স্পেনের।
এনজোর লাল কার্ড ও অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা
আর্জেন্টিনার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় মাঝমাঠের তারকা এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে অপ্রয়োজনীয় ও খামখেয়ালিভাবে দুটি হলুদ কার্ড দেখে দলকে ১০ জনের দলে পরিণত করে মাঠ ছাড়েন এনজো। এরপর স্কালোনি কোনো রকমে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে নেওয়ার জন্য দল বেঁধে রক্ষণভাগ সামলানোর কৌশল নেন। ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে ল্যামিন ইয়ামালের একটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিক মার্টিনেজ তাঁর স্বভাবসুলভ ক্ষিপ্রতায় নসাৎ করে দিলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।
অতিরিক্ত সময়ে স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজকে তুলে ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসিকে মাঠে নামানোর পর স্কালোনির ট্যাকটিক্স পরিষ্কার হয়ে যায়— যেকোনো মূল্যে খেলা টাইব্রেকার বা পেনাল্টি শুটআউট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে নিকো উইলিয়ামস ও বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো সম্পূর্ণ ফাঁকায় দাঁড়িয়ে নিশ্চিত দুটি গোলের সুযোগ মিস করলে আর্জেন্টিনার সেই স্বপ্ন বেঁচে ছিল। এর মাঝে ৯৬ মিনিটে একবার নিকো উইলিয়ামস স্পেনকে গোলের আনন্দে মাতিয়েছিলেন, কিন্তু ফাউলের কারণে রেফারি সেই গোল বাতিল করেন।
ফেরান তোরেসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ও স্পেনের অনন্য বিশ্বরেকর্ড
তবে শেষ পর্যন্ত স্পেনকে আর গোল মিসের আক্ষেপে পুড়তে হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের বিরতি থেকে ফিরে প্রথম মিনিটেই (১০৬ মিনিট) ডেডলক ভাঙেন ফেরান তোরেস। রাইট ব্যাক পেদ্রো পোরোর একটি চমৎকার ক্রস ডি-বক্সের ভেতর দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পেছন দিকে নিখুঁতভাবে ঠেলে দিয়েছিলেন নিকো উইলিয়ামস। কিছুটা দৌঁড়ে এসে বাঁ পায়ের এক জোরালো ও দর্শনীয় শটে অবশেষে দুর্ভেদ্য মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন ফেরান তোরেস। উল্লাসে ফেটে পড়ে স্প্যানিশ শিবির। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে বদলি আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড সিমিওনে গোল শোধ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শটটি পোস্টের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে চলে গেলে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন চিরতরে ভেঙে যায়।
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের পাতায় অনন্য ও নজিরবিহীন একটি নতুন রেকর্ড গড়েছে স্পেন। ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে পুরুষ ও নারী— দুই ফুটবল বিশ্বকাপেই একই সাথে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল নজির এখন স্প্যানিশদের দখলে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ফিফা নারী বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার শিরোপা জিতেছিলো স্পেনের নারী ফুটবল দল, আর এবার পুরুষ দলও সেই একই ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্ব শাসন করল।
